সহকারী শিক্ষক
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:০৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
নাছের সাহেব হুজুর—যিনি ছিলেন শিক্ষার্থীদের একান্ত আপনজন ও নির্ভরতার আশ্রয়
জনাব মাওলানা মুহাম্মদ আমির আলী—নামটি হয়তো অনেকের কাছে অপরিচিত। কিন্তু ‘নাছের সাহেব হুজুর’ বললেই সবাই একনামে চিনে নেন তাঁকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্নেহমাখা হাসি আর মমতায় ভরা এক অভিভাবকের প্রতিচ্ছবি। তিনি কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে অবসরজীবন অতিবাহিত করছেন। তাঁর বাড়ি চরম্বা ইউনিয়নের নোয়ারবিলা এলাকায়।
কেন তিনি নিজের নামের চেয়ে ‘নাছের সাহেব’ নামেই এত বেশি পরিচিত? আরবি ‘নাছের’ শব্দের অর্থ সাহায্যকারী বা সহায়তাকারী। ইংরেজিতে Academic Mentor কিংবা Student Mentor ধারণার সঙ্গে তাঁর ভূমিকার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন শিক্ষার্থীদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্নেহশীল অভিভাবক। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং পরামর্শ দিয়ে সঠিক পথ দেখানো ছিল তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।
শিক্ষার্থীদের তিনি স্নেহভরে ‘বাপ’ বলে সম্বোধন করতেন। দেখা হলেই জিজ্ঞেস করতেন, ‘বাপ, কেমন আছো? তোমার আব্বা-আম্মা কেমন আছেন?’ শুধু শিক্ষার্থীদের নাম নয়, তাঁদের বাড়ির ঠিকানা, এমনকি মা-বাবার নামও মনে রাখতেন। মা-বাবার নাম ধরে তাঁদের খোঁজখবর নিতেন। একজন শিক্ষক কতটা আন্তরিক হলে শত শত শিক্ষার্থীর এমন ব্যক্তিগত পরিচয় মনে রাখতে পারেন! তাঁর মুচকি হাসি, সহজ-সরল কথাবার্তা ও অকৃত্রিম স্নেহ তাঁকে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রিয় শিক্ষক, আপনজন ও নির্ভরতার আশ্রয়ে পরিণত করেছিল।
প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হিসেবে মাদরাসাকে প্রতিষ্ঠিত করা, শিক্ষার্থী সংগ্রহ এবং অভিভাবকদের আস্থা অর্জনে তাঁকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। তিনি চরম্বা ও নোয়ারবিলার আনাচে-কানাচে ঘুরতেন, বাড়ি বাড়ি যেতেন এবং বিশেষ করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের বুঝিয়ে তাঁদের সন্তানদের মাদরাসায় ভর্তি করানোর চেষ্টা করতেন। আজকের ভাষায় যাকে Home Visit বলা হয়, তিনি আন্তরিক দায়িত্ববোধ থেকেই সেই কাজ করতেন।
তাঁর এই প্রচেষ্টায় মাদরাসার প্রতি অভিভাবকদের আস্থা তৈরি হয়েছিল। তাঁর উৎসাহ ও সহযোগিতায় শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ মাদরাসা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক, আবার কেউ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা।
উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত জনাব আকতার হোছেন, পদুয়া স্কুলের জনাব গোলাম রসূল এবং আদালতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জনাব আব্দুল মান্নানসহ আরও অনেকে। তাঁর উৎসাহে এগিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকা করলে তা দীর্ঘ হবে। তাঁদের সাফল্যের পেছনে তাঁর অবদানের পরিমাণ আলাদাভাবে মূল্যায়নের বিষয় হলেও শিক্ষার্থী খুঁজে বের করা, শিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং ভবিষ্যৎ গঠনে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল স্মরণীয়।
মাদরাসার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ ছিল অসাধারণ। আমরা তাঁকে নোয়ারবিলার একেবারে পূর্বপ্রান্ত থেকে সাইকেল চালিয়ে মাদরাসায় আসতে দেখেছি। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রখর রোদ—কোনো কিছুই তাঁর পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। রোদে পুড়তেন, বৃষ্টিতে ভিজতেন; তবু নিয়মিত ছুটে আসতেন প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তাঁর কাছে মাদরাসা ছিল শুধু কর্মস্থল নয়, ছিল প্রাণের স্পন্দন ও ভালোবাসার ঠিকানা।
মাদরাসার উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্যও তাঁকে নিরলস পরিশ্রম করতে হয়েছে। হেমন্তে নতুন ধান ঘরে উঠলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাদরাসার জন্য ধান সংগ্রহ করতেন। ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করতেন। বার্ষিক সভা ও অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য চাল ও অনুদান সংগ্রহেও ছুটে বেড়াতেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন তুলে ধরা ছিল কষ্টসাধ্য কাজ। কিন্তু মাদরাসার প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে এসব দায়িত্ব পালনে অনুপ্রাণিত করত।
তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন মাদরাসার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, অভিভাবক ও নীরব নির্মাতা।
তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিও অত্যন্ত মধুর ও আবেগময়। তিনি আমাকে ‘বাপ’ বলে সম্বোধন করতেন। দেখা হলেই মুচকি হাসির ঝিলিক ফুটিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। তাঁর স্নেহমাখা সম্বোধন ও আন্তরিক কথাবার্তায় মনে হতো, তিনি যেন আমার খুব কাছের একজন অভিভাবক। তাঁর স্নেহ, আদর ও আপন করে নেওয়ার ভঙ্গি আজও স্মৃতিতে অমলিন।
আমাদের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি উর্দু পড়াতেন। উর্দু পাঠ্যবইয়ের ‘নাছোর তাওবা’ গল্পটি তিনি পড়িয়েছিলেন। এত বছর পরও গল্পটি মনে পড়লে মনে হয়, এই তো সেদিন তাঁর ক্লাসে বসে শুনেছিলাম! আজও যেন কানে বাজে তাঁর কণ্ঠস্বর, চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর পাঠদানের দৃশ্য। সময়ের ব্যবধানে কত পাঠ, কত ঘটনা বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছে; অথচ তাঁর পড়ানো সেই গল্পের রেশ আজও মুছে যায়নি।
মাওলানা মুহাম্মদ আমির আলী হুজুর ছিলেন বিনয়ী, নিরহংকারী ও শিক্ষার্থীবৎসল একজন মানুষ। তাঁর ‘নাছের’ পরিচয়টি কেবল একটি নাম নয়; এটি তাঁর কর্ম, স্নেহ, আন্তরিকতা এবং আজীবন শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার প্রতীক। তিনি হয়তো এখন অবসরজীবনে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তাঁর স্মৃতি কখনো অবসর নেবে না।
নাছের সাহেব হুজুর—একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক, একজন শিক্ষার্থী-সহায়ক; সর্বোপরি অসংখ্য শিক্ষার্থীর হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক প্রিয় মানুষ।
اللَّهُمَّ احْفَظْ أُسْتَاذَنَا الْفَاضِلَ مَوْلَانَا مُحَمَّدَ أَمِيرَ عَلِيٍّ، وَأَطِلْ عُمُرَهُ فِي طَاعَتِكَ، وَأَلْبِسْهُ ثَوْبَ الصِّحَّةِ وَالْعَافِيَةِ، وَبَارِكْ لَهُ فِي عُمُرِهِ وَعَمَلِهِ، وَاجْزِهِ عَنَّا وَعَنْ طُلَّابِهِ خَيْرَ الْجَزَاءِ، وَاجْعَلْ كُلَّ مَا قَدَّمَهُ مِنْ جُهْدٍ وَتَعْلِيمٍ وَإِحْسَانٍ فِي مِيزَانِ حَسَنَاتِهِ، وَأَدِمْ عَلَيْهِ نِعَمَكَ وَفَضْلَكَ، وَارْزُقْهُ سَعَادَةَ الدَّارَيْنِ، وَاخْتِمْ لَهُ بِالْخَيْرِ، إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
বাংলা অর্থ:
হে আল্লাহ! আমাদের শ্রদ্ধেয় উস্তাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আমির আলী হুজুরকে আপনার হেফাজতে রাখুন। আপনার আনুগত্যের মধ্যে তাঁর আয়ু দীর্ঘ করুন। তাঁকে সুস্বাস্থ্য ও পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। তাঁর জীবন ও কর্মে বরকত দিন। আমাদের পক্ষ থেকে এবং তাঁর সকল শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
হে পরম করুণাময়! শিক্ষাদান, শ্রম, ত্যাগ, স্নেহ ও উপকারের মাধ্যমে তিনি যে অসংখ্য কল্যাণের কাজ করেছেন, সেগুলো তাঁর নেকির পাল্লায় ভারী করে দিন। তাঁর ওপর আপনার রহমত, অনুগ্রহ ও নিয়ামত অব্যাহত রাখুন। তাঁকে ইহকাল ও পরকালের অফুরন্ত কল্যাণ ও সুখ দান করুন এবং তাঁর জীবনের পরিণতি কল্যাণময় করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
اللَّهُمَّ كَمَا جَعَلَهُ سَبَبًا لِتَعْلِيمِنَا وَإِرْشَادِنَا، فَاجْعَلْنَا سَبَبًا لِسَعَادَتِهِ وَسُرُورِهِ، وَأَكْرِمْهُ بِكَرَمِكَ، وَأَسْعِدْ قَلْبَهُ بِرُؤْيَةِ ثَمَرَةِ جُهُودِهِ فِي تَلَامِيذِهِ.
হে আল্লাহ! তিনি যেমন আমাদের শিক্ষা ও সঠিক পথের দিশা পাওয়ার মাধ্যম হয়েছেন, তেমনি আমাদেরকেও তাঁর আনন্দ ও প্রশান্তির কারণ বানিয়ে দিন। আপনার অসীম দয়ায় তাঁকে সম্মানিত করুন এবং তাঁর শিক্ষার্থীদের জীবনে নিজের শ্রমের সার্থকতা দেখে তাঁর হৃদয়কে আনন্দে পরিপূর্ণ করে দিন।
آمِينَ يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ।
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দীন। প্রাক্তন শিক্ষার্থী
#kalauzanshahrashidiafazilmadrasah #lohagara_satkania #Charamba #Noarbila
#স্মরণ #প্রিয়_শিক্ষক #MadrasahBoard #MadrasaEducation #Chattogram
১
২ মন্তব্য