সহকারী শিক্ষক
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ
সর্বজনীন পেনশন স্কিম রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম ২০২৬ | Universal Pension Scheme Registration 2026
সরকারি চাকরি করেন না বলে অবসরের পর মাসে মাসে পেনশন পাবেন না — এই ধারণাটা এখন আর ঠিক নয়। বাংলাদেশ সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিমে (Universal Pension Scheme) ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক নিজে টাকা জমিয়ে ৬০ বছর বয়স থেকে আজীবন মাসিক পেনশন পেতে পারেন। আর এই স্কিমের খবর এখন সবাই খুঁজছে — ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই স্কিমে সর্বোচ্চ ১১.৭২ শতাংশ মুনাফা হয়েছে বলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেওয়ার পর গুগল ট্রেন্ডসে "সর্বজনীন পেনশন স্কিম" খোঁজার হার একদিনে ৬০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এই লেখায় আপনি এক জায়গায় সব পাবেন — সর্বজনীন পেনশন স্কিম কী, কারা আবেদন করতে পারবেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম ধাপে ধাপে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, চাঁদা দেওয়ার নিয়ম, চারটি স্কিমের পার্থক্য, পেনশন কবে থেকে ও কীভাবে পাবেন, আর শেষে সচরাচর জিজ্ঞাসা করা প্রশ্নের উত্তর।
সর্বজনীন পেনশন স্কিম কী
সর্বজনীন পেনশন স্কিম হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি অবসরভাতা ব্যবস্থা, যেখানে বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী — যেকোনো পেশার নাগরিক নিজের নামে মাসে মাসে নির্দিষ্ট টাকা জমিয়ে ভবিষ্যতের জন্য পেনশন নিশ্চিত করতে পারেন। একে ইংরেজিতে বলে Universal Pension Scheme। অনেকে এই স্কিমকে সার্বজনীন পেনশন স্কিম নামেও খোঁজেন — দুটি বানানেই একই স্কিম বোঝায়।
এই ব্যবস্থা চলে সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ এবং সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা ২০২৪ অনুযায়ী। স্কিমটি পরিচালনা করে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ (National Pension Authority)। স্কিমটি পরিচালিত হয় সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় ২০২৩ সালের ৬ জুলাই, আর স্কিমটি চালু হয় ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট।
সহজ কথায়, এটা সরকার পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও পেনশন ব্যবস্থা। আপনি কমপক্ষে ১০ বছর নিয়মিত চাঁদা দিলে ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে পেনশন পাবেন। আপনার জমানো টাকা শুধু পড়ে থাকে না — তা ট্রেজারি বন্ডসহ লাভজনক ও নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করা হয়, আর সেই বিনিয়োগের মুনাফা আপনার হিসাবে যোগ হয়। ফলে আপনার পেনশনের টাকার পরিমাণ শুধু আপনার জমার ওপর নয়, মুনাফার ওপরও নির্ভর করে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১.৭২ শতাংশ মুনাফা
এই খবরটাই এখন সবাইকে আগ্রহী করেছে। ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর (সোমবার) জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের গ্রাহকদের ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বিনিয়োগ মুনাফা বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বনিম্ন ১১.৬৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১.৭২ শতাংশ মুনাফা অর্জিত হয়েছে।
এই অর্থবছরে স্কিমগুলোর আওতায় বিনিয়োগ করা অর্থের বিপরীতে মোট ২৮ কোটি ৯৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮ টাকা ৮০ পয়সা মুনাফা অর্জিত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এই মুনাফা গ্রাহকদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, প্রত্যেক গ্রাহকের জমার পরিমাণ ও জমার সময়কালের ভিত্তিতে অর্জিত মুনাফা তাঁদের নিজ নিজ পেনশন হিসাবে (করপাস হিসাবে) যোগ করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যিনি বেশি দিন ধরে বেশি টাকা জমিয়েছেন, তাঁর হিসাবে বেশি মুনাফা যোগ হবে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেছেন, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করা এবং গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছে। মুনাফা বণ্টনের ফলে স্কিমের গ্রাহকেরা সরাসরি উপকৃত হবেন এবং কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের পেনশন হিসাবে অর্জিত মুনাফার হিসাব ইতোমধ্যে যোগ করা হয়েছে। আপনি যদি ইতোমধ্যে এই স্কিমের গ্রাহক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার হিসাবে মুনাফা যোগ হয়েছে কিনা তা upension.gov.bd ওয়েবসাইটে লগইন করে দেখে নিতে পারবেন।
কারা আবেদন করতে পারবেন
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আবেদন করার যোগ্যতা খুবই সহজ। নিচের শর্তগুলো মিললেই আপনি আবেদন করতে পারবেন।
বয়স: ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল বাংলাদেশি নাগরিক এই স্কিমে অংশ নিতে পারবেন।
৫০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে: বিশেষ বিবেচনায় পঞ্চাশোর্ধ্ব নাগরিকেরাও এই স্কিমে যোগ দিতে পারবেন। তবে তাঁদের ১০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে চাঁদা দিতে হবে। ১০ বছর চাঁদা দেওয়া শেষ হলে তাঁরাও আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন।
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): আবেদন করার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা আবশ্যক। কারণ, রেজিস্ট্রেশন হয় NID-এর ভিত্তিতে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: আবেদনের সময় আবেদনকারীর একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা আবশ্যক। কারণ, পরবর্তীতে পেনশনের টাকা এই অ্যাকাউন্টেই জমা হবে।
পেশা: সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া বাকি সবাই — বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, গৃহিণী, ছাত্রছাত্রী (১৮ বছরের বেশি), প্রবাসী বাংলাদেশি — সবাই নিজের জন্য উপযুক্ত স্কিমে আবেদন করতে পারবেন।
কারা আবেদন করতে পারবেন না
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আলাদা পেনশন ব্যবস্থা আছে। তাই এই স্কিমটি মূলত তাঁদের জন্য নয়, যাঁদের জন্য সরকারি পেনশন নেই। নিজের পেশা অনুযায়ী চারটি স্কিমের মধ্যে যেকোনো একটিতে আবেদন করা যায়।
সর্বজনীন পেনশন স্কিম রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম ধাপে ধাপে
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আবেদন করার নিয়ম পুরোপুরি অনলাইন। ঘরে বসে মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা যায়। কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। নিচে ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়াটি দেওয়া হলো।
ধাপ ১: অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যান
প্রথমে মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্রাউজারে যান upension.gov.bd ওয়েবসাইটে। এটাই সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট। মনে রাখবেন, অন্য কোনো ওয়েবসাইট থেকে রেজিস্ট্রেশন করবেন না।
ধাপ ২: নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন অপশনে ক্লিক করুন
ওয়েবসাইটের হোমপেজে "নিবন্ধন" বা "রেজিস্ট্রেশন" (Registration) অপশনটি খুঁজে নিয়ে তাতে ক্লিক করুন। এখান থেকেই আপনার আবেদন শুরু হবে।
ধাপ ৩: NID নম্বর ও মোবাইল নম্বর দিন
রেজিস্ট্রেশন ফরমে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর, জন্ম তারিখ এবং নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিন। এই মোবাইল নম্বরেই পরবর্তীতে সব তথ্য ও OTP আসবে। তাই এমন নম্বর দিন, যেটা সবসময় আপনার কাছে থাকে।
ধাপ ৪: OTP দিয়ে যাচাই করুন
আপনার মোবাইলে একটি OTP (একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন নম্বর) পাঠানো হবে। ফরমে সেই OTP লিখে যাচাই (ভেরিফাই) করুন। OTP না এলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন অথবা আবার পাঠানোর অপশনটি ব্যবহার করুন।
ধাপ ৫: স্কিম ও মাসিক চাঁদার পরিমাণ বেছে নিন
এবার আপনার জন্য উপযুক্ত স্কিমটি বেছে নিন — প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা অথবা প্রবাস। এরপর মাসে কত টাকা চাঁদা দিতে চান, তা নির্ধারণ করুন। আপনার আয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী এমন একটি অঙ্ক বেছে নিন, যা প্রতি মাসে নিয়মিত দেওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব।
ধাপ ৬: নমিনির তথ্য দিন
আপনার মৃত্যুর পর যিনি এই সুবিধা পাবেন, তাঁকে নমিনি হিসেবে যুক্ত করুন। নমিনির নাম, সম্পর্ক এবং তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিতে হবে। চাইলে একাধিক নমিনিও দেওয়া যায়।
ধাপ ৭: ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিন
আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিন। আবেদনের সময় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা আবশ্যক। পরবর্তীতে আপনার পেনশনের টাকা এই অ্যাকাউন্টে অথবা আপনার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ) অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে।
ধাপ ৮: প্রথম চাঁদা জমা দিন
রেজিস্ট্রেশন শেষ করার জন্য প্রথম মাসের চাঁদা জমা দিতে হবে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড অথবা ব্যাংকের কাউন্টার থেকে এই টাকা জমা দেওয়া যায়।
ধাপ ৯: ইউনিক পেনশনার আইডি পান
আবেদন সম্পূর্ণ হলে আপনার অনুকূলে একটি ইউনিক পেনশনার আইডি (Unique Pensioner ID) দেওয়া হবে। এই আইডি নম্বর, জমার পরিমাণ এবং মাসিক জমা দেওয়ার তারিখ মোবাইল নম্বরে (আর প্রবাসীদের ক্ষেত্রে ইমেইলে) জানিয়ে দেওয়া হবে। এই আইডিটি যত্ন করে সংরক্ষণ করুন — ভবিষ্যতে লগইন, চাঁদা দেওয়া ও পেনশন পাওয়ার সব কাজেই এটা লাগবে।
পেনশন স্কিম লগইন করার নিয়ম
রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে যেকোনো সময় আপনার পেনশন অ্যাকাউন্টে লগইন করে জমার হিসাব, মুনাফা ও পেনশনারের তথ্য দেখতে পারবেন। পেনশন স্কিম লগইন করার নিয়মটি খুব সহজ।
প্রথমে upension.gov.bd ওয়েবসাইটে যান।
হোমপেজে "লগইন" (Login) অপশনে ক্লিক করুন।
আপনার ইউনিক পেনশনার আইডি এবং নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিন।
মোবাইলে আসা OTP দিয়ে যাচাই করুন।
লগইন হয়ে গেলে আপনার ড্যাশবোর্ডে মোট জমার পরিমাণ, জমাকৃত মুনাফা, পরবর্তী চাঁদার তারিখ এবং নমিনির তথ্য দেখতে পারবেন।
মনে রাখবেন, আপনার পেনশনার আইডি ও OTP কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কখনো ফোন করে আপনার OTP বা পাসওয়ার্ড চাইবে না।
রেজিস্ট্রেশনের জন্য যা যা লাগবে
আবেদন শুরু করার আগে নিচের জিনিসগুলো হাতের কাছে রাখুন। তাহলে পুরো কাজটি একবারেই শেষ করা যাবে।
যা লাগবে | বিস্তারিত |
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) | নিজের NID নম্বর ও জন্ম তারিখ |
মোবাইল নম্বর | নিজের নামে নিবন্ধিত, সবসময় চালু থাকে এমন নম্বর |
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট | নিজের নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট |
পাসপোর্ট সাইজের ছবি | অনলাইন ফরমে আপলোডের জন্য (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) |
নমিনির তথ্য | নমিনির নাম, সম্পর্ক ও NID তথ্য |
ইমেইল ঠিকানা | প্রবাসীদের ক্ষেত্রে আবশ্যক; অন্যদের ক্ষেত্রেও রাখা ভালো |
প্রথম মাসের চাঁদার টাকা | অনলাইন পেমেন্টের ব্যবস্থা (ব্যাংক কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং) |
চাঁদা দেওয়ার নিয়ম
রেজিস্ট্রেশনের পর প্রতি মাসে নির্ধারিত তারিখে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি উপায় আছে।
নির্ধারিত ব্যাংকের কাউন্টারে সরাসরি গিয়ে টাকা জমা দেওয়া যায়।
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ ইত্যাদি) দিয়ে টাকা দেওয়া যায়।
অনলাইন ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অটো ডেবিট চালু করা যায়। অটো ডেবিট চালু থাকলে প্রতি মাসে নির্ধারিত তারিখে আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে চাঁদার টাকা নিজে থেকেই কেটে যাবে — ভুলে যাওয়ার ভয় থাকবে না।
ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড দিয়েও চাঁদা দেওয়া যায়।
প্রবাসীদের চাঁদা দেওয়ার নিয়ম
"প্রবাস" স্কিমে অংশগ্রহণকারীরা ক্রেডিট কার্ড/ডেবিট কার্ড, অনলাইন ব্যাংকিং গেটওয়ে ব্যবহার করে বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদা দিতে পারবেন। অথবা বাংলাদেশে যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাঁরা রেমিট্যান্স পাঠান, সেই অ্যাকাউন্ট থেকেও মাসিক চাঁদা দেওয়া যাবে। প্রবাস স্কিমে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় পাঠানো মাসিক চাঁদার বিপরীতে সরকার ঘোষিত হারে প্রণোদনা পাওয়া যায়। এই প্রণোদনার টাকা তাঁর পেনশন হিসাবে যোগ হয়।
চাঁদা দিতে দেরি হলে কী হয়
কোনো মাসে চাঁদা দিতে না পারলে সঙ্গে সঙ্গে স্কিম বাতিল হয় না। বছর শেষ হওয়ার আগে সম্পূর্ণ চাঁদার টাকা দিতে না পারলে অস্থায়ীভাবে পেনশন হিসাব স্থগিত করা হয়। তবে বকেয়া টাকা পরিশোধ করলেই হিসাবটি আবার সক্রিয় করা যায়। তাই এক-দুই মাস চাঁদা মিস হলেও ঘাবড়াবেন না — বকেয়া জমা দিয়ে হিসাব চালু রাখা যায়।
চারটি স্কিম এক নজরে
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অধীনে চার ধরনের স্কিম আছে। আপনার পেশা ও আয় অনুযায়ী যেকোনো একটিতে আবেদন করা যায়। এই পোস্টে সংক্ষেপে পরিচয় দেওয়া হলো — চারটি স্কিম নিয়ে বিস্তারিত আলাদা পোস্টে থাকবে।
স্কিম | কার জন্য | মাসিক চাঁদা |
প্রগতি | বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও মালিক | ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা (বর্তমান প্যাকেজে সর্বোচ্চ ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত স্তর আছে) |
সুরক্ষা | স্বকর্মে নিয়োজিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী — যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, জেলে, তাঁতি | ৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা |
সমতা | দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের নাগরিক | মোট ১,০০০ টাকা — এর মধ্যে ৫০০ টাকা দেন চাঁদাদাতা, বাকি ৫০০ টাকা দেয় সরকার |
প্রবাস | বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক | ৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা (বর্তমান প্যাকেজে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত স্তর আছে); বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদার ওপর ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা |
প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকেরা চাইলে তাঁর পরিবারের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী এক বা একাধিক সদস্যের (যেমন — স্বামী, স্ত্রী, বাবা, মা, ভাই, বোন) নামে তাঁদের জন্য প্রযোজ্য স্কিমে নিবন্ধন করে মাসিক চাঁদা দিতে পারবেন।
পেনশন কবে থেকে পাবেন ও কীভাবে পাবেন
কমপক্ষে ১০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে চাঁদা দিলে ৬০ বছর বয়স থেকে মাসিক পেনশন পাওয়া শুরু হয়।
পেনশন আজীবন পাওয়া যায় — অর্থাৎ, যতদিন পেনশনার বেঁচে থাকবেন, ততদিন প্রতি মাসে পেনশন পাবেন।
পেনশনের পরিমাণ নির্ভর করে মোট জমার পরিমাণ ও বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফার ওপর। তাই যত বেশি দিন ধরে ও যত বেশি টাকা জমাবেন, পেনশন তত বেশি হবে।
পেনশন কত পেতে পারেন — উদাহরণ
নিচের অঙ্কগুলো স্কিম চালুর সময়ের প্রাক্কলন (উদাহরণ হিসেবে দেওয়া)। আসল পেনশনের পরিমাণ আপনার মোট জমা (করপাস) ও মুনাফার ওপর নির্ভর করবে, তাই এই অঙ্কের সঙ্গে হুবহু নাও মিলতে পারে।
কেউ ১৮ বছর বয়স থেকে ৪২ বছর বয়স পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে চাঁদা দিলে ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৬৪,৭৭৬ টাকা পেনশন পেতে পারেন।
কেউ ৩০ বছর বয়স থেকে ৩০ বছর ধরে চাঁদা দিলে ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৮,৯০৮ টাকা পেনশন পেতে পারেন।
পেনশনের টাকা কীভাবে পাবেন
পেনশনের টাকা তোলার জন্য কোনো অফিসে যেতে হবে না। পেনশনারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অথবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে (যেমন — বিকাশ, নগদ) পেনশনের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে।
মৃত্যুর ক্ষেত্রে কী হয়
চাঁদাদাতা পেনশন পাওয়ার বয়সে (৬০ বছর) পৌঁছানোর আগেই মারা গেলে তাঁর জমাকৃত টাকা মুনাফাসহ তাঁর নমিনি বা নমিনিদের ফেরত দেওয়া হবে।
পেনশনার ৭৫ বছরের আগেই মারা গেলে তাঁর নমিনি বা নমিনিরা পেনশনারের বয়স ৭৫ বছর হওয়া পর্যন্ত পেনশন পেতে থাকবেন।
তাই আবেদনের সময় সঠিক নমিনি দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরে চাইলে নমিনি পরিবর্তনও করা যায়।
জমার টাকার অন্যান্য সুবিধা
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে টাকা জমালে শুধু পেনশনই নয়, আরও কিছু সুবিধা পাওয়া যায়।
ঋণ সুবিধা: জমাকৃত টাকার অর্ধেক পর্যন্ত (৫০ শতাংশ) ঋণ হিসেবে নেওয়া যায়। জরুরি প্রয়োজনে এই সুবিধা কাজে আসতে পারে।
কর সুবিধা: সর্বজনীন পেনশন স্কিমে দেওয়া জমার বিপরীতে বিনিয়োগ কর রেয়াত (ট্যাক্স রিবেট) পাওয়া যায়। আর মাসিক পেনশন আয়কর মুক্ত থাকে। অর্থাৎ, পেনশন হিসেবে যে টাকা পাবেন, তার ওপর আয়কর দিতে হবে না।
পরিবর্তনের সুযোগ: পেনশন স্কিম, স্কিমে জমার পরিমাণ এবং নমিনি যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যায়। তবে আপনার ইউনিক পেনশনার আইডি কখনো বদলাবে না।
সাধারণ ভুল ও সতর্কতা
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আবেদন করার সময় নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন।
শুধু অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন: রেজিস্ট্রেশন ও চাঁদা দেওয়ার জন্য শুধু upension.gov.bd ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করুন। ফেসবুক বা অন্য কোনো লিংক থেকে আবেদন করবেন না।
দালাল বা এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন করবেন না: এই স্কিমে আবেদন করার জন্য কোনো এজেন্ট বা দালালের দরকার নেই। কেউ টাকার বিনিময়ে আবেদন করে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে সাবধান হোন — এটা প্রতারণা হতে পারে।
OTP ও পেনশনার আইডি গোপন রাখুন: আপনার OTP, পেনশনার আইডি ও পাসওয়ার্ড কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কখনো ফোন করে এসব তথ্য চায় না।
সঠিক মোবাইল নম্বর দিন: এমন মোবাইল নম্বর দিন, যেটা আপনার নিজের নামে নিবন্ধিত এবং সবসময় চালু থাকে। কারণ, সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই নম্বরেই আসবে।
চাঁদা নিয়মিত দিন: পেনশনের সুবিধা পুরোপুরি পেতে হলে চাঁদা নিয়মিত দেওয়া জরুরি। অটো ডেবিট চালু রাখলে চাঁদা দিতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নামে ভুয়া খবর থেকে সাবধান থাকুন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই স্কিম নিয়ে অনেক ভুয়া তথ্য ছড়ায়। যেকোনো খবরের সত্যতা যাচাই করতে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (npa.gov.bd) অথবা upension.gov.bd দেখুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
সর্বজনীন পেনশন স্কিম কি?
সর্বজনীন পেনশন স্কিম হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি অবসরভাতা ব্যবস্থা, যেখানে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক মাসে মাসে টাকা জমিয়ে ৬০ বছর বয়স থেকে আজীবন মাসিক পেনশন পেতে পারেন। এটি পরিচালনা করে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আবেদন করতে বয়স কত লাগে?
আবেদন করতে বয়স ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে হতে হয়। তবে ৫০ বছরের বেশি বয়সীরাও বিশেষ বিবেচনায় যোগ দিতে পারবেন, যদি তাঁরা ১০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে চাঁদা দেন।
NID ছাড়া কি সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আবেদন করা যায়?
না। রেজিস্ট্রেশন জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ভিত্তিতে করা হয়। তাই আবেদনের জন্য NID থাকা আবশ্যক।
সর্বজনীন পেনশন স্কিম রেজিস্ট্রেশন করতে কত টাকা লাগে?
রেজিস্ট্রেশন করতে আলাদা কোনো ফি দেওয়ার কথা সরকারিভাবে বলা হয়নি। আপনাকে শুধু প্রথম মাসের চাঁদার টাকা জমা দিতে হয়।
পেনশন স্কিমে মাসে কত টাকা চাঁদা দিতে হয়?
স্কিম অনুযায়ী মাসিক চাঁদা ৫০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হয়। প্রগতি স্কিমে বর্তমান প্যাকেজে সর্বোচ্চ ১৫,০০০ টাকা এবং প্রবাস স্কিমে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত স্তর আছে। সমতা স্কিমে মোট চাঁদা ১,০০০ টাকা, যার মধ্যে আপনি দেন ৫০০ টাকা আর সরকার দেয় ৫০০ টাকা।
চাঁদা দিতে ভুলে গেলে বা মিস করলে কী হয়?
এক-দুই মাস চাঁদা মিস হলেই স্কিম বাতিল হয় না। বছর শেষ হওয়ার আগে সম্পূর্ণ চাঁদা না দিলে হিসাবটি অস্থায়ীভাবে স্থগিত হয়। তবে বকেয়া টাকা পরিশোধ করলেই হিসাব আবার সক্রিয় করা যায়।
পেনশন স্কিম বন্ধ করার নিয়ম কী?
স্কিম, জমার পরিমাণ ও নমিনি যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যায় — এতে পেনশনার আইডি বদলায় না। চাঁদা দেওয়া বন্ধ রাখলে হিসাবটি অস্থায়ীভাবে স্থগিত থাকে এবং বকেয়া পরিশোধ করে তা আবার চালু করা যায়। স্কিম সম্পূর্ণ বন্ধ করা বা জমা টাকা তোলার বিষয়ে আলাদা কোনো ফি বা নিয়ম এই লেখায় দেওয়া হয়নি — এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে (npa.gov.bd) অথবা নির্ধারিত ব্যাংকের শাখায় খোঁজ নিন।
পেনশন স্কিমে জমা টাকা কি ফেরত পাওয়া যায়?
চাঁদাদাতা ৬০ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই মারা গেলে তাঁর জমাকৃত টাকা মুনাফাসহ নমিনিকে ফেরত দেওয়া হয়। এ ছাড়া জমাকৃত টাকার অর্ধেক পর্যন্ত ঋণ হিসেবেও নেওয়া যায়।
প্রবাসীরা কীভাবে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আবেদন করবেন?
প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনলাইনে upension.gov.bd থেকে "প্রবাস" স্কিমে নিবন্ধন করতে পারবেন। তাঁদের তথ্য মোবাইলের পাশাপাশি ইমেইলেও জানানো হয়। চাঁদা বৈদেশিক মুদ্রায় কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিং দিয়ে দেওয়া যায়, আর তাতে সরকার ঘোষিত হারে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনাও পাওয়া যায়।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে পেনশন কত টাকা পাবেন?
পেনশনের পরিমাণ নির্ভর করে আপনার মোট জমা ও বিনিয়োগের মুনাফার ওপর। উদাহরণ হিসেবে — ১৮ বছর বয়স থেকে ৪২ বছর পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে চাঁদা দিলে ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৬৪,৭৭৬ টাকা, আর ৩০ বছর বয়স থেকে ৩০ বছর চাঁদা দিলে প্রতি মাসে প্রায় ১৮,৯০৮ টাকা পেনশন পাওয়ার প্রাক্কলন দেওয়া হয়েছিল। তবে এগুলো শুধু উদাহরণ — আসল পরিমাণ আপনার জমা ও মুনাফার ওপর নির্ভর করবে।
পেনশনের টাকার ওপর কি ট্যাক্স দিতে হয়?
না। সর্বজনীন পেনশন স্কিমে দেওয়া জমার বিপরীতে বিনিয়োগ কর রেয়াত পাওয়া যায় এবং মাসিক পেনশন আয়কর মুক্ত থাকে।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট কোনটি?
রেজিস্ট্রেশন ও চাঁদা দেওয়ার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট হলো upension.gov.bd। আর জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট হলো npa.gov.bd। এই দুটি ছাড়া অন্য কোনো ওয়েবসাইট থেকে আবেদন করবেন না।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে এখনই রেজিস্ট্রেশন করে নিজের অবসর জীবন নিশ্চিত করুন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১.৭২ শতাংশ মুনাফার খবরই বলে দিচ্ছে, এই স্কিমে আপনার জমানো টাকা নিরাপদে বাড়ছে। আজ থেকে নিয়মিত চাঁদা দেওয়া শুরু করলে ৬০ বছর বয়সে আপনিও নিশ্চিন্তে মাসিক পেনশন পাবেন।
১৮
২৯ মন্তব্য