Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সুবিধা ও চাঁদার হার ২০২৬ | Universal Pension Scheme Benefits 2026

বৃদ্ধ বয়সে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট টাকা হাতে পাওয়ার ব্যবস্থার নাম সর্বজনীন পেনশন স্কিম। সহজ কথায়, আপনি এখন থেকে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেবেন, আর ৬০ বছর বয়স হলে সেই জমা টাকা আর তার মুনাফা থেকে সারা জীবন মাসে মাসে পেনশন পাবেন। সরকারি চাকরি না করলেও এখন এই সুবিধা পাওয়া যায়। বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, প্রবাসী — সবাই এই স্কিমে যোগ দিতে পারেন।


এই স্কিম নিয়ে আগ্রহ এখন হঠাৎ অনেক বেড়েছে। গুগল ট্রেন্ডস বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর "সর্বজনীন পেনশন স্কিম" খোঁজার হার একদিনে ৬০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর কারণ আছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর ঘোষণা দিয়েছে যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই স্কিমের গ্রাহকদের জমার ওপর সর্বনিম্ন ১১.৬৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১.৭২ শতাংশ মুনাফা হয়েছে। এই লেখায় চারটি স্কিমের চাঁদা, সুবিধা আর পেনশনের হিসাব — সবকিছু সহজ ভাষায় এক জায়গায় পাবেন।


এই স্কিম পরিচালিত হয় সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ অনুযায়ী, আর এর বিস্তারিত নিয়ম আছে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা ২০২৪-এ। টাকা জমা আর লেনদেনের কাজ চলে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম কয়টি

সর্বজনীন পেনশন স্কিম মোট ৪টি। এগুলো হলো প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা আর প্রবাস। চারটি স্কিমের মূল উদ্দেশ্য এক — বৃদ্ধ বয়সে মাসিক পেনশন। কিন্তু কার জন্য কোনটা, সেটা আলাদা। বেসরকারি চাকরিজীবীর জন্য প্রগতি, নিজের কাজ করেন এমন মানুষের জন্য সুরক্ষা, কম আয়ের মানুষের জন্য সমতা, আর বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য প্রবাস। নিচের তালিকায় চারটিকে একসঙ্গে দেখে নিন, তারপর প্রতিটা সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন।

পেনশন স্কিমের তালিকা — চারটি স্কিম এক নজরে

পেনশন স্কিমের তালিকা বলতে এই চারটিকেই বোঝায়। কোন স্কিমে কারা যোগ দিতে পারবেন, মাসে কত টাকা জমা দিতে হবে আর বিশেষ সুবিধা কী — সব এক টেবিলে দেওয়া হলো।


স্কিম

কার জন্য

মাসিক চাঁদার স্তর

বিশেষ সুবিধা

প্রগতি

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও মালিক

১,০০০ / ২,০০০ / ৩,০০০ / ৫,০০০ / ১০,০০০ / ১৫,০০০ টাকা (আউটসোর্সিং কর্মীদের জন্য ৫০০ টাকার স্তরও আছে)

প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে চাঁদার ৫০% প্রতিষ্ঠান আর ৫০% কর্মী দিতে পারে

সুরক্ষা

স্বকর্মে নিয়োজিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী (ছোট ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, জেলে, তাঁতি)

১,০০০ / ২,০০০ / ৩,০০০ / ৫,০০০ টাকা

নিজের আয়ের সঙ্গে মানিয়ে স্তর বেছে নেওয়া যায়, পরে বাড়ানো বা কমানো যায়

সমতা

বছরে সর্বোচ্চ ৬০,০০০ টাকা আয়ের স্বল্প আয়ের নাগরিক

মোট ১,০০০ টাকা (নিজে দেবেন ৫০০ টাকা, সরকার দেবে ৫০০ টাকা)

চার স্কিমের মধ্যে একমাত্র এটাতে সরকার চাঁদার অর্ধেক দেয়

প্রবাস

বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক

১,০০০ / ২,০০০ / ৫,০০০ / ৭,৫০০ / ১০,০০০ টাকা (বৈদেশিক মুদ্রায় সমমূল্য)

বৈদেশিক মুদ্রায় সরাসরি জমায় সরকারি ২.৫% প্রণোদনা, পরিবারের সদস্যের নামেও নিবন্ধন করা যায়

প্রগতি পেনশন স্কিম

প্রগতি স্কিম বানানো হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করেন, তাদের জন্য। প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও এতে যোগ দিতে পারেন।

কারা যোগ দিতে পারবেন

বেসরকারি কোম্পানি, কারখানা, স্কুল, হাসপাতাল, ব্যাংক বা যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এই স্কিমে যোগ দিতে পারেন। প্রতিষ্ঠান নিজে থেকে যুক্ত না হলেও একজন কর্মী নিজের উদ্যোগে নিবন্ধন করতে পারেন। আউটসোর্সিংয়ের কাজ করেন যারা, তাদের জন্য ৫০০ টাকার একটি ছোট স্তরও আছে।

মাসিক চাঁদা কত

প্রগতি স্কিমে মাসিক চাঁদার স্তর ছয়টি: ১,০০০, ২,০০০, ৩,০০০, ৫,০০০, ১০,০০০ আর ১৫,০০০ টাকা। আপনার বেতন আর মাসের খরচের হিসাব মিলিয়ে একটা স্তর বেছে নিন।

প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে সুবিধা কী

আপনার প্রতিষ্ঠান যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই স্কিমে যুক্ত হয়, তাহলে চাঁদার ৫০ শতাংশ আপনি দেবেন আর বাকি ৫০ শতাংশ দেবে প্রতিষ্ঠান। মানে আপনি মাসে ২,০০০ টাকার স্তর নিলে আপনার পকেট থেকে যাবে ১,০০০ টাকা, বাকি ১,০০০ টাকা দেবে আপনার অফিস। আর পুরো ২,০০০ টাকাই আপনার পেনশন হিসাবে জমা হবে।

কাদের জন্য ভালো

নিয়মিত বেতন পান এমন মানুষের জন্য প্রগতি স্কিম সবচেয়ে মানানসই। কারণ প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা কেটে জমা দেওয়া সহজ হয়। বেতন বাড়লে চাঁদার স্তরও বাড়িয়ে নিতে পারেন।

সুরক্ষা পেনশন স্কিম

সুরক্ষা স্কিম তাদের জন্য, যারা নিজের কাজ নিজে করেন বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মী নন।

কারা যোগ দিতে পারবেন

ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার, কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার — অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এমন যেকেউ এই স্কিমে যোগ দিতে পারেন।

মাসিক চাঁদা কত

সুরক্ষা স্কিমে চারটি স্তর আছে: ১,০০০, ২,০০০, ৩,০০০ আর ৫,০০০ টাকা।

শুরুতে কম স্তর নেওয়াই ভালো কেন

অনিয়মিত আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো মাসে কত টাকা জমা দেওয়া সম্ভব, সেটা দিয়ে হিসাব করবেন না। বরং খারাপ মাসেও যেটা দেওয়া সম্ভব, সেই পরিমাণ দিয়ে শুরু করুন। কারণ মাঝপথে চাঁদা দেওয়া বন্ধ হয়ে গেলে হিসাব স্থগিত হয়ে যায়, পরে বকেয়া দিয়ে আবার চালু করতে হয়। আয় বাড়লে পরে চাঁদার স্তর বাড়ানোর সুযোগ সবসময়ই আছে। তাই শুরুতে ১,০০০ টাকা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

সমতা পেনশন স্কিম

সমতা স্কিম চারটি স্কিমের মধ্যে আলাদা। কারণ এটাতে সরকার নিজে আপনার সঙ্গে চাঁদা দেয়।

কারা যোগ দিতে পারবেন

যাদের বছরে আয় সর্বোচ্চ ৬০,০০০ টাকার মধ্যে, অর্থাৎ মাসে গড়ে ৫,০০০ টাকার মতো আয় করেন এমন স্বল্প আয়ের নাগরিকরা এই স্কিমে যোগ দিতে পারেন।

মাসিক চাঁদা কত

সমতা স্কিমে মোট মাসিক চাঁদা ১,০০০ টাকা। এর মধ্যে আপনি দেবেন ৫০০ টাকা আর বাকি ৫০০ টাকা দেবে সরকার। মানে আপনার পকেট থেকে অর্ধেক গেলেও আপনার হিসাবে জমা হবে পুরো ১,০০০ টাকা।

কেন এটা বিশেষ

চারটি স্কিমের মধ্যে একমাত্র সমতা স্কিমেই সরকার চাঁদার অর্ধেক দেয়। তাই আয়ের শর্ত পূরণ করলে অন্য স্কিমের সঙ্গে শুধু মাসিক চাঁদার অঙ্ক তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন না। আগে যাচাই করুন আপনি সমতা স্কিমের যোগ্য কিনা। যোগ্য হলে এটাই আপনার জন্য সবচেয়ে লাভের স্কিম।

প্রবাস পেনশন স্কিম

বিদেশে যারা কাজ করেন বা থাকেন, তাদের জন্য প্রবাস স্কিম।

কারা যোগ দিতে পারবেন

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, আমেরিকা — যেকোনো দেশে কর্মরত বা অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক এই স্কিমে যোগ দিতে পারেন।

মাসিক চাঁদা কত

প্রবাস স্কিমে পাঁচটি স্তর আছে: ১,০০০, ২,০০০, ৫,০০০, ৭,৫০০ আর ১০,০০০ টাকা। বৈদেশিক মুদ্রায় সমমূল্যের টাকা জমা দেওয়া যায়। ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, অনলাইন ব্যাংকিং গেটওয়ে ব্যবহার করে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় জমা দেওয়া যায়। অথবা বাংলাদেশে আপনি যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠান, সেই অ্যাকাউন্ট থেকেও মাসিক জমা দেওয়া যাবে।

২.৫% প্রণোদনা কী

প্রবাস স্কিমে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় পাঠানো মাসিক জমার বিপরীতে সরকার ঘোষিত হারে প্রণোদনা পাওয়া যায়। এখন সেই হার ২.৫ শতাংশ। মানে আপনি ১০,০০০ টাকার সমমূল্য বৈদেশিক মুদ্রায় জমা দিলে আপনার হিসাবে আরও ২৫০ টাকা প্রণোদনা হিসেবে যোগ হবে। এই টাকাও আপনার পেনশনের হিসাবেই থাকবে।

পরিবারের সদস্যের নামে নিবন্ধন

একজন প্রবাসী চাইলে তাঁর পরিবারের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী এক বা একাধিক সদস্যের নামে নিবন্ধন করতে পারেন। স্বামী, স্ত্রী, বাবা, মা, ভাই, বোন — পরিবারের যেকেউ হতে পারেন। পরিবারের সদস্যের জন্য তাঁদের উপযুক্ত স্কিমে নিবন্ধন করে আপনি নিজেই তাদের মাসিক চাঁদা দিয়ে দিতে পারেন।

দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে এলে কী হবে

দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার পর আপনি দেশীয় মুদ্রায় চাঁদা চালিয়ে যেতে পারেন। অথবা প্রয়োজন হলে স্কিম পরিবর্তনের সুযোগও আছে। স্কিম পরিবর্তন করলেও আপনার পেনশনার আইডি একই থাকবে।

প্রবাসীদের জন্য পরামর্শ

বিদেশে বেশি আয় হচ্ছে বলে শুরুতেই সবচেয়ে বড় স্তর নেবেন না। ভাবুন, দেশে ফিরে আসার পরও একই চাঁদা চালিয়ে যেতে পারবেন কিনা। টেকসই একটা পরিমাণ দিয়ে শুরু করাই ভালো। আয় বাড়লে পরে স্তর বাড়ানো যাবে।

কোন স্কিমটি আপনার জন্য

নিচের ছকটা দেখে নিজের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে নিন।


আপনি কে

আপনার স্কিম

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন

প্রগতি

নিজের দোকান, ব্যবসা বা স্বাধীন কাজ করেন

সুরক্ষা

মাসে গড় আয় ৫,০০০ টাকার মধ্যে (বছরে ৬০,০০০ টাকা পর্যন্ত)

সমতা

বিদেশে কাজ করেন বা থাকেন

প্রবাস

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক

প্রগতি

কৃষক, শ্রমিক, জেলে, তাঁতি, রিকশাচালক

সুরক্ষা


মনে রাখবেন, স্কিম, জমার পরিমাণ আর নমিনি যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যায়। তাই ভুল স্কিম বেছে নিলেও পরে বদলে নেওয়ার সুযোগ আছে। শুধু পেনশনার আইডি একই থাকে।

চাঁদা জমা দেওয়ার মাধ্যম

প্রতি মাসের চাঁদা আপনি যেভাবে সুবিধা, সেভাবে দিতে পারেন।


  • নির্ধারিত ব্যাংকের যেকোনো শাখার কাউন্টারে সরাসরি নগদ টাকা জমা দেওয়া যায়।

  • মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ) দিয়ে জমা দেওয়া যায়।

  • অনলাইন ব্যাংকিং দিয়ে জমা দেওয়া যায়।

  • ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অটো ডেবিট চালু করা যায়, তাহলে প্রতি মাসে নিজে নিজে টাকা কেটে জমা হবে।

  • ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড দিয়েও জমা দেওয়া যায়।


জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত ব্যাংকের প্রতিটি শাখা সম্মুখ (ফ্রন্ট) অফিস হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ তথ্য জানতে বা সাহায্য পেতে যেকোনো শাখায় যেতে পারেন। আর একটা বড় সুবিধা: পেনশনের টাকা তুলতে কোনো অফিসে যেতে হয় না। পেনশনারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে (যেমন বিকাশ, নগদ) পেনশনের অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে।

কত টাকা পেনশন পাবেন — হিসাবসহ উদাহরণ

সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা করা প্রশ্ন হলো: শেষ পর্যন্ত মাসে কত টাকা পেনশন পাবো? উত্তরটা নির্ভর করে তিনটা জিনিসের ওপর: আপনি মাসে কত টাকা জমা দিয়েছেন, কত বছর ধরে জমা দিয়েছেন, আর সেই জমা টাকার ওপর কত মুনাফা হয়েছে। মানে আপনার পেনশন হবে আপনার মোট জমা (করপাস) আর তার ওপর অর্জিত মুনাফার ওপর ভিত্তি করে।

উদাহরণ ১: ১৮ বছর বয়স থেকে জমা দিলে

ধরুন, একজন ১৮ বছর বয়স থেকে ৪২ বছর বয়স পর্যন্ত একটানা চাঁদা দিলেন। অর্থাৎ মোট ২৪ বছর ধরে জমা দিলেন। স্কিম চালুর সময়ের হিসাবে তিনি ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৬৪,৭৭৬ টাকা পেনশন পাবেন। এটা সম্ভব হয় কারণ অল্প বয়স থেকে জমা শুরু করলে মুনাফা অনেক বছর ধরে বাড়তে থাকে।

উদাহরণ ২: ৩০ বছর বয়স থেকে জমা দিলে

আরেকজন ৩০ বছর বয়স থেকে ৩০ বছর ধরে চাঁদা দিলেন, অর্থাৎ ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত। স্কিম চালুর সময়ের হিসাবে তিনি ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৮,৯০৮ টাকা পেনশন পাবেন।


দুটো উদাহরণ একসঙ্গে দেখলেই বোঝা যায়, যত আগে শুরু করবেন আর যত বেশি সময় ধরে জমা দেবেন, পেনশন তত বেশি হবে।

নিজে হিসাব করবেন যেভাবে

মাসে ১,০০০ টাকা করে ১০ বছর জমা দিলে আপনার মূল জমা হবে ১,২০,০০০ টাকা। মাসে ৫,০০০ টাকা করে ১০ বছর জমা দিলে মূল জমা হবে ৬,০০,০০০ টাকা। এই মূল জমার ওপর প্রতি বছর মুনাফা যোগ হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুনাফার হার ছিল সর্বোচ্চ ১১.৭২ শতাংশ। এভাবে জমা আর মুনাফা মিলে একটা বড় অঙ্কের টাকা জমে। ৬০ বছর বয়স হলে সেই টাকা থেকে প্রতি মাসে পেনশন দেওয়া হয়, আর পেনশন চলতে থাকে সারা জীবন।


একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার: উপরের ৬৪,৭৭৬ টাকা আর ১৮,৯০৮ টাকার অঙ্ক দুটো স্কিম চালুর সময়ের উদাহরণ। আসল পেনশন নির্ভর করবে আপনার মোট জমা আর প্রতি বছর কত মুনাফা হয়েছে, তার ওপর। তাই এগুলোকে নিশ্চিত অঙ্ক না ভেবে ধারণা হিসেবে নিন।

মুনাফা ১১.৭২% — আপনার জমায় এর অর্থ কী

২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বিনিয়োগে সর্বনিম্ন ১১.৬৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১.৭২ শতাংশ মুনাফা হয়েছে। এই অর্থবছরে সব স্কিম মিলিয়ে মোট ২৮ কোটি ৯৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮ টাকা ৮০ পয়সা মুনাফা অর্জিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এই মুনাফা গ্রাহকদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।


এর মানে কী? ধরুন আপনার পেনশন হিসাবে ১,০০,০০০ টাকা জমা আছে। ১১.৭২ শতাংশ হারে এক বছরে তার ওপর প্রায় ১১,৭২০ টাকা মুনাফা যোগ হবে। এই মুনাফা আপনার হাতে নগদ দেওয়া হয় না, আপনার পেনশন হিসাবে (করপাস হিসাবে) যোগ করে দেওয়া হয়। প্রত্যেক গ্রাহকের জমার পরিমাণ আর জমার সময়কালের ভিত্তিতে মুনাফা ভাগ করে দেওয়া হয়। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেছেন, গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা আর যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ স্বচ্ছভাবে কাজ করছে।


আপনার জমার টাকা ট্রেজারি বন্ডসহ লাভজনক ও নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করা হয়। তাই এই মুনাফার হার ব্যাংকের সাধারণ সঞ্চয়ের চেয়ে অনেক ভালো।

সর্বজনীন পেনশন সুবিধা — এক নজরে

সর্বজনীন পেনশন সুবিধা শুধু মাসিক পেনশনেই শেষ নয়। এর সঙ্গে আরও অনেক সুবিধা আছে।


কর সুবিধা: স্কিমে দেওয়া জমার বিপরীতে বিনিয়োগ কর রেয়াত পাওয়া যায়। অর্থাৎ আয়কর হিসাব করার সময় এই জমার টাকায় ছাড় পাবেন। আর ৬০ বছর বয়সের পর যে মাসিক পেনশন পাবেন, সেটা সম্পূর্ণ আয়কর মুক্ত থাকবে।


ঋণের সুবিধা: জমা করা টাকার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ হিসেবে নেওয়া যায়। হঠাৎ জরুরি টাকার দরকার হলে এই সুবিধা কাজে আসে।


নমিনির সুরক্ষা: চাঁদাদাতা পেনশন পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই মারা গেলে তাঁর জমা করা টাকা মুনাফাসহ নমিনিকে ফেরত দেওয়া হয়। আর পেনশনার ৭৫ বছর বয়সের আগেই মারা গেলে তাঁর নমিনি পেনশনারের ৭৫ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত পেনশন পেতে থাকবেন।


পরিবর্তনের স্বাধীনতা: স্কিম, জমার পরিমাণ আর নমিনি যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যায়। আপনার পেনশনার আইডি কিন্তু একই থাকবে।


সহজ নিবন্ধন: জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ভিত্তিতে অনলাইনে নিবন্ধন করা যায়। আবেদন করার পর আপনাকে একটি ইউনিক পেনশনার আইডি দেওয়া হয়। আপনার মোবাইল নম্বর আর (প্রবাসীদের ক্ষেত্রে) ইমেইলের মাধ্যমে ইউনিক আইডি নম্বর, ওটিপি, জমার পরিমাণ আর মাসিক জমা দেওয়ার তারিখ জানিয়ে দেওয়া হয়। আবেদনের সময় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা আবশ্যক।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

সর্বজনীন পেনশন স্কিম কি?

সর্বজনীন পেনশন স্কিম হলো সরকারের একটি অবসরভাতা ব্যবস্থা। ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক এতে যোগ দিতে পারেন। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট টাকা জমা দিলে ৬০ বছর বয়স থেকে সারা জীবন মাসিক পেনশন পাবেন। এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট, আর এটি দেখাশোনা করে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম কয়টি?

সর্বজনীন পেনশন স্কিম মোট ৪টি: প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা আর প্রবাস। প্রতিটা আলাদা ধরনের মানুষের জন্য।

কোন স্কিমে কত টাকা চাঁদা দিতে হয়?

প্রগতি স্কিমে ১,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা, সুরক্ষা স্কিমে ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা, সমতা স্কিমে মোট ১,০০০ টাকা (নিজে ৫০০ + সরকার ৫০০), আর প্রবাস স্কিমে ১,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা। বিস্তারিত উপরের টেবিলে দেওয়া আছে।

কত বছর চাঁদা দিতে হয়?

কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দিতে হবে। ৫০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকরাও যোগ দিতে পারেন, তবে তাদেরও ১০ বছর একটানা জমা দিলে আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন।

পেনশন কবে থেকে পাব?

বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হলে মাসিক পেনশন শুরু হবে। পেনশন চলবে সারা জীবন। পেনশনের টাকা আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে।

চাঁদার পরিমাণ পরে বাড়ানো বা কমানো যায়?

হ্যাঁ, যায়। স্কিম, জমার পরিমাণ আর নমিনি যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যায়। আয় বাড়লে চাঁদার স্তর বাড়িয়ে নিতে পারেন, আবার আয় কমে গেলে কমিয়েও নিতে পারেন।

চাঁদা দিতে ভুলে গেলে বা মিস করলে কী হবে?

বছর শেষ হওয়ার আগে পুরো বছরের চাঁদা দিতে না পারলে আপনার পেনশন হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। তবে বকেয়া টাকা জমা দিলেই হিসাব আবার চালু হয়ে যাবে। তাই মিস না করাই ভালো, আর মিস হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বকেয়া দিয়ে দিন।

প্রবাস থেকে কীভাবে চাঁদা দেব?

প্রবাস স্কিমে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিং গেটওয়ে দিয়ে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় জমা দিতে পারেন। অথবা বাংলাদেশে যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠান, সেখান থেকেও দেওয়া যায়। সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় জমা দিলে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনাও পাবেন।

সমতা স্কিমে কারা যোগ দিতে পারেন?

বছরে সর্বোচ্চ ৬০,০০০ টাকা আয় করেন এমন স্বল্প আয়ের নাগরিকরা সমতা স্কিমে যোগ দিতে পারেন। এতে মাসে মোট ১,০০০ টাকা চাঁদা, যার ৫০০ টাকা আপনি দেবেন আর ৫০০ টাকা দেবে সরকার।

মারা গেলে টাকার কী হবে?

চাঁদাদাতা পেনশন পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই মারা গেলে জমা করা টাকা মুনাফাসহ তাঁর নমিনিকে ফেরত দেওয়া হয়। আর পেনশন পাওয়া শুরু করার পর ৭৫ বছর বয়সের আগেই মারা গেলে নমিনি পেনশনারের ৭৫ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত পেনশন পেতে থাকবেন।

নিবন্ধন করতে কী কী লাগে?

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), একটি মোবাইল নম্বর আর একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেই হবে। নিবন্ধন করতে হয় অনলাইনে, upension.gov.bd ওয়েবসাইটে। নিবন্ধনের পর আপনাকে একটি ইউনিক পেনশনার আইডি দেওয়া হবে।

একই ব্যক্তি কি একাধিক স্কিমে যোগ দিতে পারেন?

একজন ব্যক্তি এক সময়ে একটি স্কিমেই থাকেন। তবে স্কিম পরিবর্তন করা যায় যেকোনো সময়। আপনার অবস্থা বদলালে (যেমন দেশে ফিরে এলে বা চাকরি বদলালে) উপযুক্ত স্কিমে বদলে নিতে পারেন, পেনশনার আইডি একই থাকবে।


মন্তব্য করুন