অধ্যক্ষ
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৩ পূর্বাহ্ণ
মন খারাপের দিনে কুরআনের কাছে ফিরে যাওয়া
মন খারাপের দিনে কুরআনের কাছে ফিরে যাওয়া
জীবনের প্রতিটি দিন এক রকম হয় না। কোনো দিন আকাশের মতো মনটাও পরিষ্কার থাকে, চারপাশের সবকিছু সুন্দর মনে হয়। আবার কোনো দিন অকারণেই মন খারাপ হয়ে যায়। বুকের ভেতর জমে থাকে একরাশ কষ্ট, চোখের কোণে অশ্রু এসে ভিড় করে। কখনো প্রিয় মানুষের অবহেলা, কখনো অপূর্ণ স্বপ্ন, কখনো জীবনের অনিশ্চয়তা আমাদের ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কাউকে নিজের কষ্ট বোঝানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠিক সেই সময়টাতে আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত পবিত্র কুরআনের কাছে।
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য একটি পবিত্র গ্রন্থ নয়, এটি হৃদয়ের প্রশান্তি, জীবনের পথনির্দেশনা এবং অন্ধকার সময়ে আশার আলো। যখন পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ মনে হয়, তখন কুরআনের একটি আয়াতও হৃদয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস জাগিয়ে দিতে পারে। কারণ, কুরআনের প্রতিটি বাণীতে রয়েছে আল্লাহর রহমত, ভালোবাসা ও তাঁর দিকে ফিরে আসার আহ্বান।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সুরা আর-রা‘দ, আয়াত ২৮)
এই আয়াত যেন বিষণ্ন হৃদয়ের জন্য এক টুকরো প্রশান্তির বার্তা। আমরা যখন দুনিয়ার মানুষের কাছে স্বস্তি খুঁজি, তখন অনেক সময় হতাশ হয়ে ফিরে আসি। যাদের কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে চাই, তারাও হয়তো আমাদের অনুভূতি বুঝতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ আমাদের মনের প্রতিটি কথা জানেন। আমরা মুখে কিছু না বললেও তিনি আমাদের চোখের পানি, বুকের দীর্ঘশ্বাস এবং নীরব কষ্ট সম্পর্কে অবগত। তাই মন খারাপের দিনে তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার চেয়ে সুন্দর আশ্রয় আর কী হতে পারে?
কখনো কি এমন হয়েছে, বুকভরা কষ্ট নিয়ে কুরআন খুলে বসেছেন? হয়তো চোখের পানি মুছতে মুছতে একটি আয়াত পড়েছেন, তারপর তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করেছেন। হঠাৎ মনে হয়েছে, এই কথাগুলো যেন আপনার জন্যই নাজিল হয়েছে। যে কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারেননি, সেই কষ্টের মাঝেও যেন আল্লাহ আপনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এই অনুভূতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কখনোই একা নই। আমাদের রব আমাদের সঙ্গে আছেন, আমাদের অবস্থা তিনি জানেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।” (সুরা আশ-শারহ, আয়াত ৬)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, কষ্টই জীবনের শেষ কথা নয়। আজ যে পরিস্থিতি অসহনীয় মনে হচ্ছে, আগামীকাল হয়তো সেই অভিজ্ঞতাই আমাদের আরও ধৈর্যশীল ও শক্তিশালী করে তুলবে। জীবনের প্রতিটি পরীক্ষার পেছনে আল্লাহর হিকমত রয়েছে, যদিও আমরা সব সময় তা বুঝতে পারি না। তাই দুঃখের দিনে হতাশায় ডুবে না থেকে কুরআনের আলোয় নিজের হৃদয়কে আলোকিত করা প্রয়োজন।
মন খারাপ হলে আমরা অনেক সময় একাকিত্বে ডুবে থাকি, অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করি কিংবা অতীতের ভুলগুলো বারবার মনে করে নিজেকে কষ্ট দিই। অথচ সেই সময়টুকু আমরা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার কাজে ব্যয় করতে পারি। অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া, ধীরে ধীরে কুরআন তিলাওয়াত করা, আয়াতগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা কিংবা নীরবে নিজের মনের কথা আল্লাহকে বলা, এসবই হতে পারে প্রশান্তির পথ।
কুরআন পড়ার জন্য সব সময় অনেক সময় কিংবা বিশেষ কোনো পরিবেশের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র কয়েকটি আয়াত দিয়েও শুরু করা যায়। একটি আয়াত পড়ুন, তার অর্থ জানুন এবং ভাবুন, এই আয়াতটি আপনার জীবনে কী শিক্ষা দিচ্ছে। শুধু দ্রুত তিলাওয়াত শেষ করাই উদ্দেশ্য নয়; বরং কুরআনের বাণীকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করা এবং জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, আল্লাহর কাছে ফিরে আসার জন্য নিজেকে নিখুঁত হতে হবে না। হয়তো অনেক দিন কুরআন পড়া হয়নি, নামাজে মন বসেনি, কিংবা দুনিয়ার ব্যস্ততায় আল্লাহর কথা ভুলে গেছেন। তবুও ফিরে আসুন। আপনার অতীতের ভুলগুলো যেন আপনাকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে না রাখে। আন্তরিকভাবে তওবা করুন, ক্ষমা চান এবং নতুন করে শুরু করুন। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার শিক্ষা পবিত্র কুরআন আমাদের দিয়েছে। (সুরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)
মনে রাখবেন, কুরআনের কাছে ফিরে যাওয়া মানে জীবনের সব সমস্যা এক মুহূর্তে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো, সমস্যার মাঝেও সঠিক পথ খুঁজে নেওয়া, ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সামনে এগিয়ে চলা। প্রয়োজনে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলুন, সাহায্য চান এবং নিজের মানসিক সুস্থতার যত্ন নিন। ইসলামে ধৈর্য মানে কষ্ট অস্বীকার করা নয়; বরং কষ্টের মধ্যেও আশার আলো ধরে রাখা।
তাই যেদিন মন খুব বেশি খারাপ থাকবে, যেদিন নিজেকে ভীষণ একা মনে হবে, সেদিন একটু সময় বের করে কুরআন খুলে বসুন। হয়তো একটি আয়াতই আপনার চিন্তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে। হয়তো কোনো একটি দোয়া আপনার হৃদয়ে সাহস জোগাবে। আর হয়তো চোখের পানির মধ্য দিয়েই আপনি অনুভব করবেন, আপনার রবের কাছে ফিরে আসার পথ এখনো খোলা আছে।
মন খারাপের দিনগুলোতে কুরআন থেকে দূরে সরে যাবেন না, বরং আরও গভীরভাবে কুরআনের কাছে ফিরে যান। কারণ দুনিয়ার সব মানুষ আপনার কষ্ট বুঝতে না পারলেও আল্লাহ আপনার হৃদয়ের প্রতিটি অনুভূতি জানেন। তাঁর বাণীকে সঙ্গী করুন, তাঁর রহমতের আশা রাখুন এবং বিশ্বাস করুন, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আল্লাহর ইচ্ছায় নতুন ভোর আসতে পারে।
১
২ মন্তব্য