সহকারী শিক্ষক
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০১ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
গুণগত শিক্ষার প্রথম শর্ত: শিক্ষকতা হোক মেধাবীদের স্বপ্নের পেশা
আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক অবস্থান, কর্মজীবনের সুযোগ এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের সম্ভাবনার কথা ভেবে মানুষ পেশা নির্বাচন করে থাকেন। আমাদের দেশে বিসিএস বা যে কোনো চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীরা এসব দিক বিবেচনা করে পেশা নির্ধারণ করেন। প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, ট্যাক্সসহ অন্যান্য ক্যডারের পর অনেকেই শিক্ষা ক্যাডার পছন্দ করেন। অন্যান্য যে কোনো চাকরির ক্ষেত্রে অনেকের কাছে এটি প্রথম পছন্দের পরিবর্তে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়ে ওঠে। কাঙ্ক্ষিত অন্য পেশায় প্রবেশ করতে না পেরে কেউ কেউ শিক্ষকতাকে বেছে নেন। শিক্ষকতাকে যদি কেউ ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে না নেন এবং মেধাবীরা তাদের স্বপ্নের বা আকাঙ্ক্ষার পেশা হিসেবে গ্রহণ না করে, তবে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
একটি শিশুর চিন্তার জগৎ প্রসারিত করা, তার মধ্যে যুক্তিবোধ সৃষ্টি করা, নৈতিকতার ভিত্তি গড়ে তোলা এবং তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রস্তুত করার কাজে শিক্ষকের ভূমিকার বিকল্প নেই। মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য চাই মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষক। শিক্ষকের যোগ্যতা, মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা ও কর্মপরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করলে এ পেশায় মেধাবীরা এগিয়ে আসবে।
একজন শিক্ষক প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাজ করেন। তার একটি ব্যাখ্যা শিক্ষার্থীর কাছে জটিল বিষয়কে সহজ করে তুলতে পারে, আবার একটি অসতর্ক মন্তব্য তার আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানতে পারে। তার উৎসাহ একজন শিক্ষার্থীকে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান দিতে পারে, আবার উদাসীনতা তার শেখার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। এ কারণে শিক্ষকতার মান কেবল ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতার বিষয় নয়; এটি একটি প্রজন্মের চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন পেশাটির প্রতি গভীর অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার তৈরির একটি কার্যকর উপায় হলো শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তরুণদের সামনে শিক্ষকতাকে সম্ভাবনাময় ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে তুলে ধরা।
কোনো শিক্ষার্থী যদি মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষক হওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করে, তবে তার নিজের প্রস্তুতির ধরনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। সে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা, যোগাযোগক্ষমতা, নেতৃত্ব, বিশ্লেষণী চিন্তা ও প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার প্রতি মনোযোগী হবে। নিজের শিক্ষকদের কাজ পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে চেষ্টা করবে, কীভাবে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখেন, কীভাবে কঠিন বিষয় সহজভাবে বোঝান এবং কীভাবে ভিন্ন সক্ষমতা ও আগ্রহের শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর শেখার পরিবেশ তৈরি করেন। ফলে শিক্ষক হওয়ার প্রস্তুতি কেবল চাকরির পরীক্ষাকেন্দ্রিক না থেকে দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত বিকাশের অংশ হয়ে উঠবে।
এ ধরনের মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করা গেলে রাষ্ট্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ শিক্ষককে দক্ষ করে তোলার দায়িত্ব শুধু নিয়োগের পর শুরু হলে চলবে না; তার আগেও শিক্ষকতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা, আগ্রহ এবং প্রাথমিক যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ থাকা দরকার। শিক্ষক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বেড়ে ওঠা তরুণরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণে অধিক সচেতন হতে পারেন। তবে আগ্রহ থাকলেই যে একজন ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো শিক্ষক হয়ে উঠবেন, তা নয়। ব্যক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসম্মত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত অনুশীলন, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পরামর্শ এবং নিয়মিত পেশাগত মূল্যায়ন অপরিহার্য। অর্থাৎ শিক্ষক তৈরির প্রক্রিয়াকে নিয়োগের একটি আনুষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে না দেখে একটি ধারাবাহিক উন্নয়নব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মেধাবী তরুণ কেন শিক্ষকতাকে নিজের প্রথম পছন্দ হিসেবে গ্রহণ করবেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে পেশাটির বাস্তব সামাজিক অবস্থানের দিকে তাকাতে হবে। যে সমাজে শিক্ষককে সম্মান করার কথা বলা হয়, অথচ বাস্তবে তাকে অবজ্ঞা, অপমান বা অনিরাপদ কর্মপরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়, সেখানে নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষকতা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে কীভাবে? যে পেশায় দায়িত্ব অনেক, অথচ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও পেশাগত স্বীকৃতি তুলনামূলকভাবে সীমিত, সেখানে মেধাবীদের দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন। শিক্ষক যদি নিয়মিত অসম্মান, অযৌক্তিক চাপ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন, তবে তার ব্যক্তিগত জীবন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি পেশাগত উদ্যমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি শুধু সৌজন্য প্রদর্শন বা আনুষ্ঠানিক সম্মাননার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, শিক্ষকদের প্রতি অপমানজনক আচরণের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা রক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভিন্নমত প্রকাশ, সমালোচনা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যের সম্মান বজায় রাখতেও শেখে। শিক্ষকের কোনো ভুল বা অনিয়ম থাকলে তার প্রতিকার অবশ্যই হতে হবে; তবে অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া হতে হবে প্রমাণনির্ভর, ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ। জবাবদিহি এবং সম্মান পরস্পরের বিরোধী নয়, একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থায় দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ নিশ্চিত করা। দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন, নিয়মিত পদোন্নতি, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ এবং কাজের স্বীকৃতি শিক্ষকদের পেশাগত বিকাশে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হলে তাদের বুঝতে হবে যে এই পেশায় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, নেতৃত্ব এবং সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ রয়েছে। শুধু শিক্ষকতার মহত্ত্বের কথা বলে তাদের কাছ থেকে ত্যাগ প্রত্যাশা করলে চলবে না; সেই মহত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে শিক্ষকতার ইতিবাচক দিক তুলে ধরে আলোচনা, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মতবিনিময়, শিক্ষকতা বিষয়ে ক্যারিয়ার সেমিনার এবং শিক্ষাদানভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রম আয়োজন করা যেতে পারে। দক্ষ ও অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষকদের কাজকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা তাদের পেশাগত অবদান সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা ও গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, মেন্টরশিপ এবং পেশাগত প্রস্তুতির সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এতে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন কেবল একটি আবেগী আকাঙ্ক্ষা হিসেবে থাকবে না; তা বাস্তব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির রূপ পাবে।
শিক্ষকতার প্রতি আকর্ষণ তৈরির লক্ষ্য হওয়া উচিত যোগ্য, দায়িত্বশীল, মানবিক ও সৃজনশীল মানুষকে শিক্ষকতায় আগ্রহী করে তোলা এবং তাদের যোগ্যতার বিকাশের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। পেশাটির প্রবেশপথে মানসম্মত নির্বাচনব্যবস্থা, নিয়োগ-পরবর্তী প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের কাজের মূল্যায়নেও শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, নৈতিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
গুণগত শিক্ষার জন্য বড় বাজেট, আধুনিক ভবন, ডিজিটাল যন্ত্রপাতি কিংবা আকর্ষণীয় পাঠ্যক্রম অবশ্যই প্রয়োজনীয় উপাদান; কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষে সেগুলোকে অর্থবহ করে তোলার মানুষের ওপর। সেই মানুষটি হলেন শিক্ষক। তাই শিক্ষায় বিনিয়োগের পরিকল্পনায় শিক্ষককে কেন্দ্রীয় স্থানে রাখতে হবে। তার দক্ষতা বাড়ানো, মর্যাদা রক্ষা, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য যে ব্যয় হবে, তাকে নিছক প্রশাসনিক খরচ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
আমরা যদি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে তরুণেরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না, যুক্তিবাদী, মানবিক, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে, তাহলে শিক্ষকতার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতেই হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নও দেখাতে হবে। কারণ অন্য পেশার মানুষ সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করেন, আর একজন ভালো শিক্ষক অসংখ্য মানুষের সম্ভাবনা বিকশিত করার ভিত্তি তৈরি করেন। তার হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাই একদিন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে।
শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তব সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া তাই শুধু শিক্ষকদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্ন। যে দেশে শিক্ষকতা মেধাবীদের আকাঙ্ক্ষিত পেশা হয়ে উঠবে, যে দেশে শিক্ষক সম্মান পাবেন তার কাজের জন্য, নিরাপত্তা পাবেন তার দায়িত্ব পালনে এবং বিকাশের সুযোগ পাবেন তার যোগ্যতা অনুযায়ী, সে দেশই মানসম্মত শিক্ষার পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে। গুণগত শিক্ষার সংস্কার শুরু হোক শিক্ষককে যথাযথভাবে মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে; আর সেই সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হোক নতুন প্রজন্মের মনে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা। (Collected)
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা কলেজ।
০
০ মন্তব্য