প্রভাষক
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৫৪ অপরাহ্ণ
# মফস্বলের বালিকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী কম—কেন, আর কী করা যায়?
# মফস্বলের বালিকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী কম—কেন, আর কী করা যায়?
**আনিছুর রহমান**
প্রভাষক, রসায়ন
আবেদা খানম গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ
করটিয়া, টাঙ্গাইল
বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে—এ কথা অনেক মেয়েই বলে। তবু মাধ্যমিক পেরিয়ে কলেজে ভর্তির সময় তাদের অনেকেই বিজ্ঞান বিভাগ বেছে নিতে সাহস পায় না। মফস্বলের এমপিওভুক্ত বালিকা কলেজগুলোতে এ চিত্র প্রায়ই দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে দূরে থাকে কেন? আর তাদের পাশে দাঁড়াতে আমরা কী করতে পারি?
## বিজ্ঞান কি সত্যিই এত কঠিন?
অনেক শিক্ষার্থীর মনে বিজ্ঞান নিয়ে একধরনের ভয় কাজ করে। তারা ভাবে, বিজ্ঞান মানেই কঠিন অঙ্ক, অনেক পড়া, ভালো ফল না করলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার ও আশপাশের মানুষের নানা কথা—“বিজ্ঞান পড়া খুব চাপের”, “মেয়েদের পক্ষে সামলানো কঠিন” কিংবা “অন্য বিভাগে পড়লে ভালো হবে।”
এ ধরনের কথা শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। অথচ সঠিক সহায়তা ও নিয়মিত চর্চা পেলে বিজ্ঞান শেখা অনেকের কাছেই আনন্দের হতে পারে।
## কম ভর্তির পেছনে যেসব কারণ
বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার খরচও কিছু পরিবারের জন্য চিন্তার বিষয়। বই, যাতায়াত, ব্যবহারিক সামগ্রী—সব মিলিয়ে বাড়তি ব্যয় হতে পারে। কোথাও আবার ল্যাবরেটরি বা ব্যবহারিক ক্লাসের সুযোগ সীমিত। বিজ্ঞানের বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখার সুযোগ না থাকলে শিক্ষার্থীর আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন।
আরেকটি বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থী জানে না বিজ্ঞান পড়ে ভবিষ্যতে কী কী করা যায়। তাদের সামনে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার কথা বলা হলেও বিজ্ঞান শিক্ষা যে আরও বহু পেশা ও উচ্চশিক্ষার পথ খুলে দেয়, তা সব সময় স্পষ্ট করে বোঝানো হয় না।
গণিত ও ইংরেজিতে ভিত্তি দুর্বল হলেও শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগে যেতে দ্বিধা করে। আগের শ্রেণিতে কোথাও বুঝতে অসুবিধা হলে, সেই ঘাটতি নিয়ে তারা পরের ধাপে উঠতে ভয় পায়। এই ভয়কে দূর করতে পাশে একজন শিক্ষক, অভিভাবক বা সহপাঠীর উৎসাহ অনেক কাজে আসে।
## পরিবর্তন শুরু হতে পারে শ্রেণিকক্ষ থেকেই
শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভীতি কমাতে পাঠকে সহজ, পরিচিত ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। বইয়ের ধারণা আশপাশের ঘটনা, ছোট পরীক্ষা ও দৈনন্দিন উদাহরণ দিয়ে বোঝালে বিষয়টি আর দূরের বা দুর্বোধ্য মনে হয় না। সামান্য উপকরণ দিয়েও অনেক কিছু হাতে-কলমে শেখানো সম্ভব।
যেসব শিক্ষার্থী গণিত বা বিজ্ঞানে পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস কিংবা ছোট দলে পড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ভুল করলে বকা না দিয়ে প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিলে তারা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়।
অভিভাবকদের সঙ্গেও খোলামেলা আলোচনা জরুরি। মেয়ের আগ্রহ, সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত—শুধু প্রচলিত ধারণা বা ভয়ের ভিত্তিতে নয়। বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে অভিভাবক সভায় আলোচনা করলে অনেক সংশয় দূর হতে পারে।
## অনুপ্রেরণার দরকার, চাপের নয়
বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছেন বা পেশাজীবনে সফল হয়েছেন—এমন নারীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানো যেতে পারে। তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনলে মেয়েরা বুঝতে পারবে, বিজ্ঞান তাদের জন্যও সম্ভাবনার পথ। বিজ্ঞান মেলা, কুইজ, বিজ্ঞান ক্লাব বা ছোট প্রকল্পেও শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া দরকার।
অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বই, বৃত্তি বা ব্যবহারিক উপকরণের সহায়তা থাকলে অর্থের কারণে তাদের পছন্দের বিষয় ছেড়ে দিতে হবে না। এ কাজে কলেজ, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজ একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।
## শেষ কথা
বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী কম ভর্তি হওয়ার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহকে দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের ভয়, আর্থিক বাস্তবতা, শিক্ষার সুযোগ এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব—সবকিছুর দিকেই নজর দিতে হবে।
একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্বাস করতে শেখে, “আমি চেষ্টা করলে পারব,” তখন তার সামনে নতুন পথ খুলে যায়। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি সেই বিশ্বাস তৈরি করতে পারে, তাহলে মফস্বলের মেয়েরাও বিজ্ঞান শিক্ষায় এগিয়ে আসবে। তাদের আগ্রহকে সুযোগে রূপ দেওয়াই আমাদের সবার দায়িত্ব।
১৮
২৯ মন্তব্য