সহকারী শিক্ষক
৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:২৬ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
সফরনামা: ইতিহাসের জীবন্ত পাঠশালায় একদিন এবং খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ
ইতিহাসের জীবন্ত পাঠশালায় একদিন: খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ পরিদর্শনের শিক্ষণীয় সফরনামা
ভূমিকা
শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে কিংবা পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসকে জীবন্তভাবে উপলব্ধি করতে এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে প্রয়োজন ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা। 'গুণগত শিক্ষা' (Quality Education) নিশ্চিতকরণের এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সম্প্রতি আমি পা বাড়িয়েছিলাম ৪০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যের শহর পুরান ঢাকার লালবাগে। উদ্দেশ্য—মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য ও কম আলোচিত রত্ন 'খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ' ও এর চারপাশের মুঘল নিদর্শনসমূহ অবলোকন এবং এর ঐতিহাসিক পেক্ষাপটকে শিক্ষার আলোয় তুলে আনা।
উপ-অনুচ্ছেদ: সফরের শিক্ষণীয় উদ্দেশ্য (Learning Outcomes)
শিক্ষক হিসেবে যেকোনো শিক্ষাসফর বা হেরিটেজ ট্যুরের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু শিক্ষণীয় উদ্দেশ্য থাকে। এই সফরটি থেকে শিক্ষার্থীরা মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে জ্ঞান লাভ করতে পারবে:
১. ঐতিহাসিক জ্ঞান অর্জন: পাঠ্যবইয়ে পড়া মুঘল আমল, সুবেদার ও কাজীদের শাসনব্যবস্থা এবং 'মৃধা' বা 'মিধা'র মতো ঐতিহাসিক পদবির উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা বাস্তব ধারণা পাবে।
২. স্থাপত্য ও প্রকৌশল বিদ্যা: ৩২০ বছরের পুরনো একটি দোতলা ও খিলানযুক্ত (তাহখানা) কাঠামোর টিকে থাকার কৌশল দেখে শিক্ষার্থীরা প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, জ্যামিতিক পরিমাপ এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের পরিবেশবান্ধব প্রকৌশল সম্পর্কে শিখতে পারবে।
৩. সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও সংরক্ষণ চেতনা: দেশের অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সচক্ষে দেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশপ্রেম জাগ্রত হবে এবং জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতি তারা দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে।
ইতিহাসের খোঁজে: 'মৃধা' বংশের উৎপত্তি ও খান মোহাম্মদ মৃধা
ভ্রমণের শুরুতেই মননশীল অনুসন্ধান জাগিয়ে তোলে 'মৃধা' বা 'মিধা' বংশের ইতিহাসকে। ইতিহাস পর্যালোচনার আলোয় দেখা যায়, মৃধা কোনো একক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বংশ নয়; এটি মূলত মুঘল ও প্রাক-ব্রিটিশ আমলের একটি উচ্চ সামরিক ও প্রশাসনিক পদবি, যা কালক্রমে বংশনামে রূপান্তরিত হয়েছে। ফারসি ও আরবি শব্দ থেকে বিবর্তিত এই পদের অর্থ—সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম শ্রেণীর কমান্ডার বা পদাতিক সৈন্যের প্রধান।
এই বংশের কীর্তিমানদের মধ্যে ঐতিহ্যের পাতায় যার নাম সবচেয়ে স্বর্ণাক্ষরে লেখা, তিনি হলেন খান মোহাম্মদ মৃধা। ১৭১৬ হিজরি (১৭০৪-১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে) মুঘল সুবেদার ফররুখশিয়রের শাসনামলে তৎকালীন ঢাকার প্রধান কাজী, কাজী ইবাদুল্লাহর আদেশে তিনি নির্মাণ করেন এক ঐতিহাসিক মসজিদ ও মাদ্রাসা চত্বর, যা আজ 'খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ' নামে পরিচিত। প্রবেশদ্বারের ফারসি শিলালিপি আজও এই মননশীল সৃষ্টির অনন্য দলিল হিসেবে সাক্ষ্য দিচ্ছে।
স্থাপত্যের অনন্য পাঠশালা: মৃধা মসজিদের ভেতরের রূপ
পুরান ঢাকার ১২১ লালবাগ রোডের আতশখানা মহল্লায় অবস্থিত এই মসজিদে প্রবেশ করতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। লালবাগ কেল্লা থেকে মাত্র ৪০০-৫۰۰ মিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই স্থাপনাটি মুঘল প্রকৌশল বিদ্যার এক চমৎকার ও মননশীল নিদর্শন।
১. রহস্যময় 'তাহখানা': মসজিদটি সাধারণ ভূমির ওপর নির্মিত নয়, অথচ ভূমি থেকে প্রায় ১৬.৫ ফুট উঁচুতে নির্মিত একটি বিশাল খিলানযুক্ত প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর নিচে রয়েছে ব্যারেল বা পিপা আকৃতির ছাদবিশিষ্ট অনেকগুলো ছোট ছোট কক্ষ, যাকে 'তাহখানা' বলা হয়। মুঘল আমলে এটি দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের থাকার হোস্টেল ও মুসাফিরখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
২. প্রাচীন মাদ্রাসা ও লাইব্রেরি: প্ল্যাটফর্মের ওপরে উত্তর অংশে রয়েছে একটি উন্মুক্ত হলরুম, যা তৎকালীন ঢাকার অন্যতম প্রাচীন আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র বা মাদ্রাসা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এটি ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চার কিতাবখানা বা লাইব্রেরি।
৩. ত্রিরত্ন গম্বুজ ও চত্বর: পূর্ব পাশের সুদৃশ্য পাথরের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে চোখে পড়ে বিশাল উন্মুক্ত চত্বর এবং এর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত তিনটি আকর্ষণীয় গম্বুজবিশিষ্ট মূল মসজিদ ভবন। গম্বুজের নিচের পদ্মফুলের নকশা (Lotus motif) এবং দেয়ালের চমৎকার কুলুঙ্গি বা মেহরাব মুঘল আভিজাত্যের মূর্ত প্রতীক।
একই সুতোয় গাঁথা ইতিহাস: লালবাগ থেকে আহসান মঞ্জিল
মৃধা মসজিদ পরিদর্শন শেষে এর সংলগ্ন এলাকার অন্যান্য মুঘল নিদর্শন দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। মাত্র ৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা (কেল্লা আওরঙ্গবাদ), যেখানে রয়েছে শায়েস্তা খানের দরবার হল ও রাজকীয় হাম্মামখানা। কেল্লার ঠিক মাঝখানে মার্বেল ও কষ্টিপাথরে নির্মিত পরী বিবির মাজার মুঘলদের স্থাপত্যিক দূরদর্শিতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
ইতিহাসের এই রুট ধরে রিকশাযোগে এগিয়ে গেলে একে একে দেখা মেলে আরমানিটোলার তারা মসজিদ (Star Mosque), যার গা জুড়ে রয়েছে চিনামাটির তারকারাজি, এবং প্রাচীন আর্মেনিয়ান চার্চ। বুড়িগঙ্গার তীরে গিয়ে শেষ হয় এই সফরনামা, যেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকার নবাবদের জাঁকজমকপূর্ণ গোলাপী প্রাসাদ 'আহসান মঞ্জিল'।
পুরান ঢাকার রসনা বিলাস ও কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা
পুরান ঢাকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অসমাপ্ত থেকে যায় যদি সেখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়া না হয়। লালবাগ কেল্লার বিপরীতের বিখ্যাত দোকানের শাহী কাচ্চি বিরিয়ানির সুগন্ধ আর তন্দুরে তৈরি মচমচে গরম গরম বাকরখানি (যা প্রতি পিস মাত্র ৫-১০ টাকায় পাওয়া যায়) যেন এই অঞ্চলের সংস্কৃতিরই অংশ।
তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এই ভ্রমণে কিছু প্রাক-প্রস্তুতি জরুরি। পুরান ঢাকার সরু রাস্তা ও তীব্র যানজটের কারণে বড় গাড়ির বদলে রিকশা বা পায়ে হেঁটে চলাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া, আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনের জন্য ইদানিং অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সহজেই টিকিট কেটে নেওয়া যায়, যা সময় সাশ্রয় করে।
শিক্ষক বাতায়নে গুণগত শিক্ষায় এর গুরুত্ব (উপসংহার)
খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে শিক্ষার্থীদের নিয়ে 'হেরিটেজ ট্যুর' বা ঐতিহাসিক শিক্ষাসফর আয়োজন করা হলে তা গুণগত শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শিক্ষার্থীরা যখন পাঠ্যবইয়ের মুঘল আমলকে নিজের চোখে দেখতে পাবে, তাদের মাঝে ইতিহাস সচেতনতা, দেশপ্রেম এবং প্রাচীন শিল্পকলার প্রতি পরম শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হবে। আসুন, আমাদের শিক্ষার্থীদের কেবল মুখস্থ বিদ্যায় আবদ্ধ না রেখে ইতিহাসের এই জীবন্ত পাঠশালাগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
কলমে:
মোস্তাফিজুর রহমান
সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)
চৌবাড়ীয়া মালশিরা উচ্চ বিদ্যালয়
তানোর, রাজশাহী।
কবি ও গবেষক
ORCHID ID: 0009-0003-6300-1705
#mostafezur_rahman_
০
০ মন্তব্য