প্রভাষক
৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
দাঁতে কেন ক্যাভিটি হয়
আমাদের অনেকেরই হয়তো দাঁতে ফিলিং করানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। দাঁতে ক্যাভিটি বা ক্ষয় দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন হতেই হয়। সেখানে ড্রিল মেশিনের সাহায্যে দাঁতের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিষ্কার করে তাতে ফিলিং করা হয়।
দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা কোটি কোটি মানুষকে ভোগাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদন এমনটাই বলছে।
জীববিজ্ঞানীদের কাছে ক্যাভিটি এক অদ্ভুত বিষয়। মানুষের দাঁতের এনামেল হলো শরীরের সবচেয়ে শক্ত টিস্যু, যা কয়েক দশক ধরে খাবার চিবানো, গুঁড়ো করা এবং কাটার উপযোগী করেই তৈরি। বন্য প্রাণীদের দাঁত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ে যায়, ভেঙে যায় বা পড়ে যায়।
কিন্তু মানুষের দাঁতে আমরা যেভাবে ক্যাভিটি দেখি, বন্যপ্রাণীদের ক্ষেত্রে তা সচরাচর দেখা যায় না। প্রাচীনকালের শিকারি বা খাবার সংগ্রহকারী মানুষের খুলি পরীক্ষা করলে একই চিত্র দেখা যায়। তাদের দাঁত হয়তো প্রচণ্ডভাবে ক্ষয়ে গেছে, কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, তাতে ক্যাভিটি খুবই কম।
এখানে আসলে কী ঘটল, কী বদলাল? সহজ কথায় উত্তর হলো—মানুষের দাঁত বদলায়নি। খাদ্যাভ্যাসের কারণেই এই পরিবর্তন ঘটে। খাদ্যাভ্যাসের কারণেই দাঁতের মাইক্রোস্কোপিক ইকোসিস্টেম বদলে যায়।
দাঁতের ক্ষয় আসলে ইকোসিস্টেমের সমস্যা
দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি সাধারণ কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি জৈবিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল। দাঁতের ওপর জমে থাকা আঠালো স্তর, যাকে ডেন্টাল প্লাক বলা হয়, সেখানে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো চিনি এবং শর্করা জাতীয় খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে।
খাবার হজম করার সময় তারা অ্যাসিড নিঃসরণ করে। এই অ্যাসিড দাঁতের এনামেল থেকে খনিজ উপাদানগুলো টেনে বের করে নেয়। আর এই অ্যাসিডের আক্রমণের গতি যদি মুখের স্বাভাবিক সেরে ওঠার ক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তবেই শেষ পর্যন্ত সেখানে ক্যাভিটি দেখা দেয়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেন্টাল অ্যান্ড ক্রানিওফেশিয়াল রিসার্চ জানায়, দাঁতের ক্ষয় শুরুর দিকেই ধরা পড়লে তা সারিয়ে তোলা সম্ভব। এটা থেকে বোঝা যায়, দাঁতের সমস্যা হঠাৎ একদিনে হয় না, বরং এটি দাঁতের মধ্যকার ভারসাম্যের একটি বিষয়।
দন্ত গবেষকরা প্রায়ই একে ইকোলজিক্যাল প্লাক হাইপোথিসিস দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। এ সংক্রান্ত গবেষণা ২০০৬ সালে বিএমসি ওরাল হেলথ জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ক্যাভিটি সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলো বাইরে থেকে আসে না, বরং এরা দাঁতেই বসবাস করে। অনুকূল পরিবেশ পেলেই এরা সংখ্যায় বেড়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেয়।
মুখে যদি ক্রমাগত শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার দেওয়া হয় এবং পরিবেশ অম্লীয় থাকে, তবে স্ট্রেপটোকক্কাস মিউটানসের মতো অ্যাসিড-সহনশীল ও অ্যাসিড-উৎপাদনকারী জীবাণুগুলো তাদের আশপাশের অন্য উপকারী জীবাণুদের হটিয়ে সংখ্যায় বেড়ে যায়। এতে মুখের ভেতরের অণুজীবদের যে ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ থাকে, তা নষ্ট হয়ে যায়।
ডেন্টাল প্লাককে একটি বাগানের সঙ্গে তুলনা করা যাক। সঠিক পরিবেশ থাকলে বাগান সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। যদি এমন সার দেওয়া শুরু করা হয়, যা শুধু আগাছারই উপকারে আসে, তবে শেষ পর্যন্ত সেখানে আগাছারই বিস্তার হয়ে থাকে।
০
০ মন্তব্য