Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৬:৫৪ অপরাহ্ণ

লালন সাঁই: মানবতার এক চিরন্তন সাধক--- পংকজ কান্তি গোপ

লালন সাঁই: মানবতার এক চিরন্তন সাধক--- পংকজ কান্তি গোপ

🏵️অবতরণিকা: মানুষে মানুষে বিভেদ, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাতপাতের অহংকার আর সামাজিক বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে যিনি মানুষকেই সত্যের প্রধান আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, তিনি বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁই। তাঁর সাধনা ছিল মানুষের মুক্তির সাধনা, তাঁর দর্শন ছিল মানবতার দর্শন, আর তাঁর সংগীত ছিল সাম্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ।

লালন সাঁই কেবল একজন মরমি সাধক কিংবা লোকসংগীতের স্রষ্টা নন; তিনি ছিলেন প্রচলিত সমাজব্যবস্থার নানা অসংগতি, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও জাতিগত বিভেদের বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তাঁর গানে উঠে এসেছে মানুষের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, দেহতত্ত্ব, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের গভীর মমত্ববোধ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন মানুষের কৃত্রিম পরিচয় নিয়ে, খুঁজেছেন মানুষের অন্তর্নিহিত সত্যকে। তাঁর কালজয়ী দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই, মানবতার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই।

🏵️জন্ম ও শৈশব: রহস্যে ঘেরা এক জীবন

লালন শাহের জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে ইতিহাসে খুব বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সাধারণভাবে ১৭৭২ বা ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দকে তাঁর জন্মসাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জন্মস্থান হিসেবে ঝিনাইদহের হরিশপুর এবং কুষ্টিয়ার ভাঁড়রা গ্রামের নাম পাওয়া যায়।

তাঁর পারিবারিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ তাঁকে হিন্দু পরিবারের সন্তান বলেছেন, কেউ বলেছেন মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, লালন নিজে কখনো এসব পরিচয়কে বড় করে দেখেননি। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল সবার আগে।

লালনের জীবনের শুরুর দিকের একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি হলো, তীর্থযাত্রার পথে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে চলে যান বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে। পরে সিরাজ সাঁই নামের একজন ফকির তাঁকে আশ্রয় ও সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এই ঘটনার পর তাঁর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় বলে প্রচলিত জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ কাহিনির সব বিবরণ ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়।

সেই সময় থেকেই তিনি সংসারের প্রচলিত পরিচয় ও সামাজিক বিভেদের বাইরে গিয়ে এক নতুন জীবনদর্শনের সন্ধান করতে থাকেন। মানুষের মধ্যে মানুষকে খুঁজে বেড়ানোই হয়ে ওঠে তাঁর সাধনার প্রধান লক্ষ্য।

🏵️ছেঁউড়িয়ায় লালনের কর্মজীবন ও সাধনা

লালন শাহের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়। এখানেই তিনি তাঁর আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। আখড়াটি শুধু তাঁর বসবাসের জায়গা ছিল না; এটি ছিল গান, সাধনা, আলোচনা ও মানবিক মিলনের এক বিশেষ কেন্দ্র।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ তাঁর কাছে আসত। কেউ আসত গান শুনতে, কেউ আসত জীবনের নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে, আবার কেউ আসত তাঁর সান্নিধ্যে থেকে সাধনার পথ জানতে। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের পরিচয়ই বেশি গুরুত্ব পেত।

লালন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন-এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। কিন্তু জীবন, প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজকে পর্যবেক্ষণ করে তিনি যে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তা তাঁর গানে অসাধারণভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

তিনি ছিলেন একাধারে বাউল সাধক, গীতিকার, সুরকার, দার্শনিক ও সমাজচিন্তক। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন মত রয়েছে। তাঁর নিজের হাতে লেখা গানের কোনো নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। শিষ্য ও ভক্তদের মুখে মুখেই তাঁর গান পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়ে।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর, বাংলা ১২৯৭ সালের ১ কার্তিক, কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একজন মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটলেও তাঁর গান ও দর্শনের যাত্রা থেমে যায়নি।

🏵️লালনের দর্শন: সবার ওপরে মানুষ

লালন শাহের দর্শনের মূল কথা ছিল মানুষ। তিনি মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ দেখতে চাননি। তাঁর কাছে মানুষকে চেনার প্রধান উপায় ছিল তার মন, বিবেক ও মানবিক আচরণ।

আমরা সাধারণত মানুষকে বিভিন্ন পরিচয়ে চিনি। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খ্রিষ্টান। কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র। কেউ উচ্চবংশের, কেউ সাধারণ পরিবারের। কিন্তু লালন আমাদের প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, এসব পরিচয়ের বাইরে মানুষের আসল পরিচয় কোথায়?

তাঁর বিখ্যাত গান ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ এই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে। এই গানে তিনি জাতপাতের ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন। মানুষের শরীর, রক্ত, জন্ম ও জীবনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যে এমন কোনো বিভাজন নেই, যা দিয়ে একজন মানুষকে অন্যজনের চেয়ে ছোট বা বড় বলা যায়।

লালনের কাছে ধর্ম ছিল মানুষের আত্মিক উন্নতির বিষয়, বিভেদের অস্ত্র নয়। তিনি কোনো ধর্মকে ছোট করেননি; বরং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেছেন।

তাঁর এই চিন্তাই তাঁকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধকে পরিণত করেছে।

🏵️লালনের দশটি আলোচিত গান ও তার অন্তর্নিহিত শিক্ষা

লালনের গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা। তিনি জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের কৃত্রিম পরিচয়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর গানে মানুষই মুখ্য, মনুষ্যত্বই প্রধান। আত্মপরিচয় অনুসন্ধান, মানবদেহের রহস্য, স্রষ্টার সন্ধান এবং জীবনের চিরন্তন সত্য তাঁর গানের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

লালন সাঁইয়ের অসংখ্য কালজয়ী গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দশটি গান হলো—

১. খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।

২. সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।

৩. জাত গেল জাত গেল বলে।

৪. মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষের সনে।

৫. সময় গেলে সাধন হবে না।

৬. বাড়ির কাছে আরশিনগর, সেথা এক পড়শি বসত করে।

৭. আমার ঘরের চাবি পরের হাতে।

৮. এমন মানব জনম আর কি হবে।

৯. মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।

১০. তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে।

🏵️বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে লালনের সম্পর্ক

লালন শাহের জীবনের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের আরেক মহীরুহ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ জমিদারি পরিচালনার কাজে শিলাইদহ অঞ্চলে আসা-যাওয়া করতেন। সেই সূত্রে তিনি কুষ্টিয়া অঞ্চলের লোকসংগীত, বাউল সংস্কৃতি ও লালনের গানের সঙ্গে পরিচিত হন। তবে লালন ও রবীন্দ্রনাথের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।

রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহ ও সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকায় তিনি লালনের বিশটি গান প্রকাশ করেন। তাঁর 'গোরা' উপন্যাসেও লালনের একটি গানের ভাব ও অংশ ব্যবহৃত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ লালনের গানের মধ্যে যে গভীর মানবতাবাদ, আত্মজিজ্ঞাসা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা খুঁজে পেয়েছিলেন, তা তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। রবীন্দ্রনাথের নিজের সাহিত্য ও সংগীতেও মানুষের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য, মানবপ্রেম এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান দেখা যায়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লালন ছিলেন গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় গান রচনা করা একজন সাধক। আর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দুজনের সামাজিক অবস্থান ও পরিচয় আলাদা হলেও মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং মানবমুক্তির চিন্তায় তাঁদের মধ্যে এক ধরনের গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ও উদ্যোগের ফলে লালনের গান শিক্ষিত সমাজে আরও বেশি পরিচিতি লাভ করে। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ লালনকে নতুন করে আবিষ্কার করেননি; বরং তাঁর গানের মূল্য অনুধাবন করে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

🏵️বর্তমান সময়ে লালনের চেতনা কেন এত জরুরি?

আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। মানুষ এখন মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট ও আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়-প্রযুক্তিতে উন্নত হওয়ার পাশাপাশি আমরা কি মানবিকতাতেও উন্নত হচ্ছি?

আজও সমাজে ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত বিভেদ, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এবং নানা ধরনের অসহিষ্ণুতা দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমতের মানুষকে অপমান করা, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিদ্রূপ করা কিংবা গুজব ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার ঘটনাও ঘটে।

এমন পরিস্থিতিতে লালন সাঁইয়ের দর্শন আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও অন্যের ধর্ম ও বিশ্বাসকে সম্মান করা যায়। অন্যের মতের সঙ্গে একমত না হয়েও তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা সম্ভব। একজন মানুষকে তার ধর্ম, বর্ণ, আর্থিক অবস্থা কিংবা পারিবারিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা উচিত নয়।

শিক্ষার্থীদের জন্যও লালনের শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধর্ম, পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের শিক্ষার্থী একসঙ্গে পড়াশোনা করে। তোমাদের মধ্যে কেউ ভালো ফলাফল করে, কেউ অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকে। কেউ সচ্ছল পরিবারের সন্তান, কেউ সাধারণ পরিবারের। কিন্তু বিদ্যালয়ে তোমরা সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী।

কোনো সহপাঠী অন্য ধর্মের বলে তাকে অবহেলা করা, কারও আর্থিক অবস্থা নিয়ে উপহাস করা কিংবা কারও ভিন্নমতকে অসম্মান করা শিক্ষার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

মনে রাখতে হবে, প্রকৃত শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে বিবেকবান, যুক্তিবাদী, সহনশীল ও মানবিক করে তোলে।

আমরা যদি লালনের জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার চর্চা করতে পারি, তাহলে আমাদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।

🏵️বিদ্যালয়ে লালনচর্চা: নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সুযোগ

সম্প্রতি লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস জাতীয়ভাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৭ অক্টোবরকে সরকার 'ক' শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে লালন বিষয়ে আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অ্যাসাইনমেন্ট গ্রহণের উদ্যোগও নিয়েছে।

এটি আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি চমৎকার সুযোগ। কারণ শুধু পাঠ্যবই পড়ে লালনের মতো একজন মানুষকে সম্পূর্ণভাবে জানা সম্ভব নয়। তাঁর গান শুনতে হবে, তাঁর জীবন সম্পর্কে জানতে হবে, তাঁর দর্শন নিয়ে ভাবতে হবে।

বিদ্যালয়ে লালনের গান পরিবেশন, তাঁর জীবন ও দর্শন নিয়ে আলোচনা, রচনা প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে তাঁর গানগুলোর ভাবার্থ বিশ্লেষণ করতে পারে। এতে তারা শুধু একজন বাউল সাধক সম্পর্কে জানবে না, নিজেদের সমাজ ও সংস্কৃতিকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করবে।

তবে লালনকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় হবে তাঁর মানবিক শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে ধারণ করা। একটি বিদ্যালয়ে যদি শিক্ষার্থীরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখে, দুর্বল সহপাঠীর পাশে দাঁড়ায় এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখে, তাহলেই লালনের দর্শনের প্রকৃত চর্চা হবে।

🏵️উপসংহার: লালন বেঁচে থাকবেন মানুষের ভালোবাসায়

লালন শাহ আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর গান আছে, তাঁর দর্শন আছে, তাঁর মানবিক চিন্তা আছে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তাঁর আখড়া আজও মানুষের মিলনস্থল। সেখানে প্রতিবছর তাঁর তিরোধান দিবসে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ সমবেত হন। বাউলরা গান করেন, সাধকরা সাধনায় মগ্ন হন, আর সাধারণ মানুষ তাঁর জীবন ও দর্শন থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেন।

লালন আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষকে ভালোবাসতে হলে আগে মানুষের পরিচয়কে সম্মান করতে হবে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সামাজিক অবস্থানের বিভেদ ভুলে সবাইকে আপন করে নিতে হবে। নিজের ভেতরের মানুষটিকে চিনতে হবে।

আমরা যদি তাঁর গান শুধু গাই, কিন্তু তাঁর মানবিক শিক্ষা নিজেদের জীবনে গ্রহণ না করি, তাহলে তাঁকে যথার্থভাবে স্মরণ করা হবে না।

আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তোমাদের মধ্যে কেউ চিকিৎসক হবে, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ সাহিত্যিক, কেউ বিজ্ঞানী কিংবা প্রশাসক হবে। তোমাদের পেশা যা-ই হোক, সবার আগে একজন ভালো মানুষ হতে হবে।

লালন সাঁইয়ের জীবন থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটিই-মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই, মানবতার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই।

তাই আসুন, আমরা শুধু লালনের গান নয়, লালনের মানবতাবাদী চেতনাকেও হৃদয়ে ধারণ করি। এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো বিভেদ থাকবে না; থাকবে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা।

লেখক: পংকজ কান্তি গোপ, সিনিয়র শিক্ষক, পুটিজুরী শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, বাহুবল, হবিগঞ্জ।

👉তথ্যসূত্র:

১) লালনশাহ: জীবন ও গান- এস এম লুৎফর রহমান

২) অখণ্ড লালনসঙ্গীত- আবদেল মাননান

৩) ইন্টারনেট

মন্তব্য করুন