সহকারী শিক্ষক
৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৪৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
সিলেবাসের বাইরে-আমার দেখা আমার ছাত্রী
-পংকজ কান্তি গোপ
‘পাঠ্যবইয়ের বাইরে বেশি বই পড়লে পরীক্ষার ফল ভালো হবে না’- শিক্ষার্থী, অভিভাবক এমনকি অনেক শিক্ষকের মধ্যেও এই ধারণাটি বেশ প্রচলিত। ফলে পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে গল্প-উপন্যাস তো দূরের কথা, পাঠ্যসূচির বাইরের বইয়ের নামও অনেক শিক্ষার্থীর কাছে যেন নিষিদ্ধ। অথচ হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার জান্নাতুল মাওয়া মীম সেই প্রচলিত ধারণার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি করেছে এক চমৎকার ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সকল বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে মীম। শুধু ভালো ফল করেছে- এটুকু বললে তার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই বলা হবে না। কারণ মীমের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি বিস্ময়কর সংখ্যা-১২৮।
এ পর্যন্ত ১২৮টি সৃজনশীল বই পড়ে শেষ করেছে সে। এর মধ্যে রয়েছে ৭১টি উপন্যাস, ১৯টি নাটক, ২০টি গল্পগ্রন্থ ও ১০টি আত্মজীবনী। শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পই পড়েছে ৪৪টি। নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বই পড়ার সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় একশতে।
মীমের পাঠের তালিকায় রয়েছে বাংলা সাহিত্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ ও কালজয়ী সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা, চোখের বালি, গল্পগুচ্ছ; বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী; সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ, সাতকাহন; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি; বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের অবরোধবাসিনী-এমন অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বই তার পাঠের সঙ্গী হয়েছে। পড়েছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, , হুমায়ূন আহমেদসহ দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান লেখকদের নানা রচনা।
প্রশ্ন জাগতেই পারে- সে এত বই পড়ার সময় পেল কীভাবে?
উত্তরটি খুব সরল। কিন্তু বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মীম মোবাইল ফোন ব্যবহার করত না।
যে সময়ে অনেক শিক্ষার্থী প্রতিদিনের মূল্যবান সময়ের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোনের পর্দায় ব্যয় করে, সেই সময়টিই মীম ব্যয় করেছে বইয়ের পাতায়। অন্যরা যখন ভার্চুয়াল জগতে ঘুরে বেড়িয়েছে, মীম তখন ঘুরেছে শরৎচন্দ্রের চরিত্রের সঙ্গে, বিভূতিভূষণের প্রকৃতির পথে, রবীন্দ্রনাথের মানবজগতের ভেতর, মানিকের নদীর স্রোতে কিংবা সমরেশ মজুমদারের সময়ের ভেতর।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার- মীম কিন্তু পাঠ্যবইকে অবহেলা করেনি। বরং নিয়মিত রুটিন করে পাঠ্যবই পড়েছে। কোনো পড়া জমিয়ে রাখেনি। ফলে সিলেবাসের পড়াশোনা শেষ করে যে সময়টুকু হাতে পেয়েছে, সেটিই দিয়েছে সৃজনশীল বইকে।
এখানেই মীমের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি লুকিয়ে আছে।
বই পড়ার জন্য সময় পাওয়া যায় না-বরং সময় বের করে নিতে হয়।
মীমের শিক্ষক হিসেবে শুরুতে তার এত বই পড়ার বিষয়টি আমার কাছেও কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। আমার কাছ থেকেই সে অনেক বই নিয়ে পড়েছে। কখনো কখনো তাকে বলেছি, ‘এখন হয়তো এত বই না পড়লেও পারো।’ কিন্তু যখন দেখেছি, বই পড়ার পাশাপাশি তার পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনাও ঠিকঠাক চলছে, তখন আর তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করিনি। বরং অজান্তেই তৈরি হয়েছিল, তার প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন স্নেহ। সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছিলাম। পরীক্ষার আগ পর্যন্ত বিশেষ নজরদারিতে রেখেছিলাম তাকে। কারণ, কোনো কারণে মীম ফলাফল খারাপ করলে এর দায় হয়ত কিছুটা আমাকেও নিতে হতো।
আজ মীমের ফলাফল যেন সেই নীরব সহযোগিতারও একটি সুন্দর উত্তর।
তার সাফল্যের আরেকটি দিকও উল্লেখ করার মতো। পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক ও উপস্থাপনাতেও সমান পারদর্শী মীম। সে মনে করে, বাহুবলের একমাত্র উচ্চারণ ও আবৃত্তি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ‘চারুপাঠ’-এ ছয় মাসের প্রশিক্ষণ তার আত্মবিশ্বাস ও প্রকাশক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বই পড়ার অভ্যাস এবং সাংস্কৃতিক চর্চা তার চিন্তা ও ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
মীমের গল্প তাই কেবল একজন শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়। এটি আমাদের প্রচলিত কিছু ধারণাকে নতুন করে ভাবার গল্প।
আমরা অনেক সময় সন্তানকে বলি-‘পরীক্ষা সামনে, গল্পের বই বন্ধ করো।’ অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল-'তোমার পাঠ্যবইয়ের পড়া ঠিক আছে তো? থাকলে এবার কোন বইটি পড়ছ?’
কারণ সৃজনশীল বই পাঠ্যবইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তা পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানকে আরও গভীর, বিস্তৃত ও জীবন্ত করে তুলতে পারে। সাহিত্যের বই একজন শিক্ষার্থীকে শুধু তথ্য দেয় না, মানুষকে বুঝতে শেখায়, সমাজকে দেখতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, কল্পনা করতে শেখায়। ভাষাকে করে সমৃদ্ধ, চিন্তাকে করে পরিণত।
আর মীমের গল্প আমাদের সামনে আরও একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- আমাদের সন্তানদের হাতে আমরা কী তুলে দিচ্ছি? বই, নাকি সারাক্ষণ জ্বলতে থাকা একটি মোবাইলের পর্দা?
মোবাইল প্রযুক্তি আমাদের প্রয়োজনের অংশ-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রয়োজন আর আসক্তির মধ্যে পার্থক্য আছে। একটি শিশু বা কিশোর যখন অবসর পেলেই বইয়ের বদলে মোবাইলের দিকে ছুটে যায়, তখন তার কল্পনার জগতটিও ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। মীম দেখিয়েছে, মোবাইল ছাড়াও আনন্দময় একটি জগৎ আছে- সেটি বইয়ের জগৎ।
১২৮টি বই পড়েও মীমের ফল খারাপ হয়নি। বরং সে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হয়ে সকল বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। একই সঙ্গে সে হয়েছে একজন পাঠক, আবৃত্তিশিল্পী, বিতার্কিক ও উপস্থাপক।
যে পড়তে জানে, সে শুধু পরীক্ষায় ভালো করে না; সে জীবনকেও একটু বেশি করে বুঝতে শেখে।
মীমের সামনে এখন আরও বড় পথ। তার বইয়ের তালিকা আরও দীর্ঘ হোক, জ্ঞানের জগৎ আরও বিস্তৃত হোক-এই প্রত্যাশা। আর তার গল্প ছড়িয়ে পড়ুক বাহুবল থেকে সারা দেশে।
হয়তো কোনো এক বিকেলে কোনো মা তার সন্তানকে বলবেন, ‘মোবাইলটা একটু রেখে বইটা পড়ো।’
হয়তো কোনো শিক্ষক পরীক্ষার আগে কোনো শিক্ষার্থীকে বলবেন, ‘পাঠ্যবই ঠিকমতো পড়ছ তো? পড়লে একটি ভালো উপন্যাসও পড়তে পারো।’
আর কোনো এক কিশোরী মীমের ১২৮টি বইয়ের গল্প শুনে নিজের হাতে তুলে নেবে একটি বই। সেদিনই মীমের সাফল্য সত্যিকার অর্থে আরও বড় হয়ে উঠবে।
লেখক: পংকজ কান্তি গোপ
সিনিয়র শিক্ষক, পুটিজুরী শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, বাহুবল, হবিগঞ্জ।
৩
৪ মন্তব্য