সহকারী অধ্যাপক
০১ নভেম্বর, ২০২৬ ০৫:২৭ পূর্বাহ্ণ
সূরা আশ-শূরা (الشورى) (ওহির আলো, আল্লাহর মহত্ত্ব, ক্ষমা ও মানবজীবনের মুক্তির পথ)
সূরা আশ-শূরা (الشورى)
(ওহির আলো, আল্লাহর মহত্ত্ব, ক্ষমা ও মানবজীবনের মুক্তির পথ)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ চিরন্তন হিদায়াতের বাণী। এ মহাগ্রন্থ মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখায়, জীবনের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে শেখায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দিশা দেয়। সূরা আশ-শূরা পবিত্র কুরআনের ৪২তম সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে মোট ৫৩টি আয়াত রয়েছে। সূরাটি পবিত্র কুরআনের ২৫তম পারায় অবস্থিত। ‘আশ-শূরা’ শব্দের অর্থ পরামর্শ বা পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
এ সূরার প্রাথমিক আয়াতগুলোতে আল্লাহর মহত্ত্ব, ক্ষমতা, একত্ববাদ, ওহির ধারাবাহিকতা, ফেরেশতাদের তাসবিহ, মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং মানুষের কর্মের ওপর আল্লাহর পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এসব শিক্ষা মানুষের ঈমান, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।
ওহি—মানবজাতির জন্য আল্লাহর হিদায়াত
সূরা আশ-শূরার প্রথম দুই আয়াতে ‘হা-মীম’ এবং ‘আইন-সীন-ক্বাফ’—এমন বিচ্ছিন্ন আরবি বর্ণমালা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোকে হুরূফে মুকাত্তাআত বলা হয়। এসব বর্ণের প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
তৃতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি যেমন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ওহি প্রেরণ করেছেন, তেমনি তাঁর পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের প্রতিও ওহি নাজিল করেছেন। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।
এ আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষা কোনো নতুন বা বিচ্ছিন্ন মতবাদ নয়; বরং সব নবী-রাসুলের দাওয়াতের মূল ভিত্তি ছিল একই—একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং পরকালীন জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত থাকা।
ওহি মানুষের জ্ঞান ও বিবেককে সঠিক পথে পরিচালিত করে। মানুষ নিজের সীমিত জ্ঞান দিয়ে সব বিষয়ে চূড়ান্ত সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। তাই মহান আল্লাহ নবী-রাসুলদের মাধ্যমে মানবজাতিকে সত্যের পথ দেখিয়েছেন। কুরআন সেই হিদায়াতের সর্বশেষ ও সংরক্ষিত ঐশী গ্রন্থ।
আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও অসীম মহত্ত্ব
চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, সবই আল্লাহর। তিনিই সর্বোচ্চ ও মহান।
সমগ্র সৃষ্টি তাঁর মালিকানাধীন। আকাশের বিশালতা, পৃথিবীর বিস্তৃতি, পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, গ্রহ-নক্ষত্র এবং দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের সবকিছু তাঁর সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণাধীন। মানুষের সম্পদ, ক্ষমতা, মর্যাদা কিংবা জ্ঞান—কোনোটিই প্রকৃত অর্থে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; সবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত।
এ বিশ্বাস মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং বিনয়ী হতে শেখায়। যে ব্যক্তি উপলব্ধি করে, তার সবকিছুই আল্লাহর দান, সে মানুষের প্রতি অবিচার করে না, সম্পদের বড়াই করে না এবং নিজের সামর্থ্যকে আল্লাহর অনুগ্রহের বাইরে মনে করে না।
আল্লাহ সর্বোচ্চ ও মহান। তাঁর মহত্ত্বের তুলনা কোনো সৃষ্টির সঙ্গে করা যায় না। তিনি সৃষ্টির মুখাপেক্ষী নন; বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী।
সৃষ্টিজগতের মহিমা ও ফেরেশতাদের তাসবিহ
পঞ্চম আয়াতে আকাশমণ্ডলীর মহিমা ও ফেরেশতাদের ইবাদতের কথা তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে, আকাশমণ্ডলী তাদের ওপর থেকে বিদীর্ণ হওয়ার উপক্রম হয়। ফেরেশতারা তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেন এবং পৃথিবীবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
এ আয়াত মহান আল্লাহর অসীম মহত্ত্ব ও সৃষ্টিজগতের ওপর তাঁর পরাক্রমের এক গভীর চিত্র তুলে ধরে। ফেরেশতারা আল্লাহর অনুগত সৃষ্টি। তাঁরা সর্বদা তাঁর নির্দেশ পালন করেন এবং তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করেন।
এখানে মানুষের জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মানুষ যেন নিজের জীবনকে আল্লাহর স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যে সাজায়। দুনিয়ার ব্যস্ততা, সম্পদের মোহ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ যেন তাকে তার স্রষ্টার স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে না রাখে।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহর ক্ষমাশীলতা ও দয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি গফুর ও রহিম—অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তাই কোনো মানুষ ভুল করে হতাশ হয়ে পড়বে না; বরং আন্তরিকভাবে তাওবা করে আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের দিকে ফিরে আসবে।
তাওহিদ ও শিরক থেকে আত্মরক্ষা
ষষ্ঠ আয়াতে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি পর্যবেক্ষক। তাদের কাজের দায়ভার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নয়।
এ আয়াত তাওহিদের মৌলিক শিক্ষা সুস্পষ্ট করে। ইবাদত, চূড়ান্ত আনুগত্য এবং উপাসনার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। কোনো ব্যক্তি, বস্তু কিংবা সৃষ্টিকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা বা ইবাদতের অংশীদার করা ইসলামের আকিদার পরিপন্থী।
মানুষের জীবনে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক থাকবে। কিন্তু এসব সম্পর্ক যেন আল্লাহর অধিকার ও নির্দেশনার ঊর্ধ্বে স্থান না পায়। প্রকৃত মুমিন সব অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং তাঁর বিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
এ আয়াত আরও শিক্ষা দেয়, মানুষের দায়িত্ব হলো সত্যের বাণী পৌঁছে দেওয়া, সৎকাজের আহ্বান জানানো এবং যথাসাধ্য কল্যাণকর উপদেশ দেওয়া। কিন্তু কারও অন্তরের বিশ্বাস জোর করে পরিবর্তন করা কিংবা অন্যের কাজের দায় নিজের ওপর নেওয়া মানুষের দায়িত্ব নয়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে।
সূরা আশ-শূরার প্রাথমিক আয়াতগুলোর জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা
সূরার আলোচ্য আয়াতগুলো থেকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—
১. আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস: সব ধরনের ইবাদত ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত রাখতে হবে।
২. ওহির অনুসরণ: কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে।
৩. আল্লাহর মহত্ত্ব উপলব্ধি: নিজের জ্ঞান, সম্পদ ও ক্ষমতা নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
৪. নিয়মিত আল্লাহর স্মরণ: জীবনের প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা, পবিত্রতা ঘোষণা ও ইবাদতে মনোযোগী হতে হবে।
৫. ক্ষমা ও তাওবার প্রত্যাশা: ভুল হলে হতাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হতে হবে এবং সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
৬. মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতা: অন্যের কল্যাণ কামনা করতে হবে, ন্যায়সংগত উপদেশ দিতে হবে এবং কারও প্রতি জুলুম করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৭. নিজের কর্মের জবাবদিহি: প্রত্যেক মানুষকে মনে রাখতে হবে, তার কথা ও কাজ আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়।
৮. আল্লাহর ওপর ভরসা: বিপদে ধৈর্য ধারণ, বৈধ উপায় অবলম্বন এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে।
উপসংহার
সূরা আশ-শূরার প্রাথমিক ছয়টি আয়াত আমাদের সামনে ঈমান, তাওহিদ, ওহি, আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, ফেরেশতাদের ইবাদত এবং মহান রবের ক্ষমা ও দয়ার এক গভীর তাৎপর্য তুলে ধরে। এ আয়াতগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ; তাঁর জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণের বাইরে কিছুই নেই। তিনি মহাপরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী, সর্বোচ্চ ও মহান।
অতএব, মানুষের উচিত কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গঠন করা, আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস রাখা, শিরক ও অন্যায় থেকে দূরে থাকা, নিয়মিত তাওবা করা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা। পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী মোহে পড়ে পরকালকে ভুলে না গিয়ে প্রতিটি কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহির প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
হে মহান আল্লাহ! আমাদের অন্তরে বিশুদ্ধ ঈমান, জীবনে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ, কর্মে সততা, আচরণে বিনয় এবং হৃদয়ে আপনার প্রতি গভীর ভালোবাসা দান করুন। আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল রাখুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।
৩
৪ মন্তব্য