প্রভাষক
০১ জুন, ২০২৩ ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
প্রভাষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ দ্বাদশ
বিষয়ঃ ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র
অধ্যায়ঃ চতুর্থ অধ্যায়
একটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ ও উপবিভাগে কর্মরত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ও অবস্থানগত চিত্রকে ঐ প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো বলে। সাংগঠনিক কাঠামো সাংগঠনিক কাযাবলি নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পাদনের রূপরেখা প্রদান করে। এর মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও কর্মপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিক ও নিয়মতান্ত্রিক চিত্র ফুটে ওঠে। তাই প্রয়োজনের সাথে সংগতি নানা ধরনের সংগঠন কাঠামো আমরা দেখতে পাই।
আনুষ্ঠানিকতার বিচারে :
ক. আনুষ্ঠানিক সংগঠন : যে সংগঠন কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক নির্দিষ্ট নিয়মকানুন বা রীতিনীতি মেনে গড়ে ওঠে তাকে আনুষ্ঠানিক সংগঠন বলে। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক সংগঠন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কর্মরত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সাংগঠনিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এরূপ সংগঠনের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিভিন্ন পদ, প্রত্যেক পদে সম্পাদিত কাজ, দায়িত্ব, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা নির্দিষ্ট করা হয়। এছাড়াও উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কে ও কার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত থাকবে বা কার কাছ থেকে আদেশ লাভ করবে বা তার কাজের জন্য কার কাছে জবাবদিহি করবে তাও পূর্বেই নির্ধারিত থাকে। আনুষ্ঠানিক সংগঠন পাঁচ ধরনের হয়ে থাকে। নিচে এগুলো আলোচনা করা হলো :
১. সরলরৈখিক সংগঠন : যে সংগঠন কাঠামোতে কর্তৃত্ব উচ্চ পর্যায় থেকে এবং জবাবদিহিতা নিচ পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ে হস্তান্তরিত হয় তাকে সরলরৈখিক সংগঠন বলে। সরলরৈখিক সংগঠন কাঠামো অনেকটা সরলাকৃতির মতো মনে হওয়ায় এর নাম হয়েছে সরলরৈখিক সংগঠন। সামরিক সংগঠনে আদেশ দানে সরলরৈখিক গতিরেখার প্রতি যে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয় সেক্ষেত্রে অনুরূপ নীতিমালা অনুসরণ করা হয় বলে একে সামরিক সংগঠনও বলা হয়ে থাকে।
২. সরলরৈখিক ও উপদেষ্টা সংগঠন : যে সংগঠন কাঠামোতে সরলরৈখিক নির্বাহীকে পরামর্শ ও সহযোগিতা করার জন্য একজন উপদেষ্টা কর্মী নিয়োগ করা হয় তাকে সরলরৈখিক নির্বাহী ও উপদেষ্টা বা পদস্থ কর্মী সংগঠন বলে। এরূপ সংগঠনে দুই ধরনের কর্মী থাকে। এরা হলোÑ ১. সরলরৈখিক নির্বাহী এবং ২. সহযোগী বা পদস্থ নির্বাহী। বর্তমান বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের সংগঠন সবচেয়ে বেশি উপযোগী। কারণ বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের চাপ বেশি থাকে। যে কারণে সরলরৈখিক নির্বাহীতে কর্মভারগ্রস্ত হয়ে পড়তে হয়। এমতাবস্থায় তাকে সহযোগিতা বা পরামর্শ দেওয়ার জন্য একজন উপদেষ্টা বা বিশেষজ্ঞ কর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে বিশেষজ্ঞ বা উপদেষ্টা কর্মী সরলরৈখিক নির্বাহীকে পরামর্শ দিতে পারলেও আদেশ নির্দেশ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন না।
৩. কার্যভিত্তিক সংগঠন : যে সংগঠন কাঠামোতে প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলিকে কাজের প্রকৃুতি অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয় এবং প্রতিটি বিভাগে একজন করে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে কার্যভিত্তিক সংগঠন বলে। বৃহদায়তন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সংগঠন ব্যবহৃত হয়। তবে এ ধরনের সংগঠন কাঠামোতে উপদেষ্টাগণ সরাসরি নির্বাহীর মর্যাদা লাভ করে। সরলরৈখিক সংগঠনের সম্পূর্ণ বিপরীত সংগঠন হচ্ছে কার্যভিত্তিক সংগঠন। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক এফ. ডব্লিউ টেলর কার্যভিত্তিক সংগঠনের উদ্ভাবক।
৪. কমিটি সংগঠন : কমিটি হলো কতিপয় ব্যক্তির সমষ্টি যাদের ওপর প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয় এবং যারা প্রদত্ত দায়িত্বসমূহ যথাযথভাবে সম্পাদনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্যার্জনে নিয়োজিত থাকে। সাধারণত প্রতিষ্ঠানের উচ্চস্তরের কর্মচারীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিষ্ঠানের বাইরের সদস্যদের নিয়েও কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটি সংগঠনের মূলকথা হচ্ছে মিলিত বা সমষ্টিগতভাবে কোনো বিশেষ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কাজ করা। সমš^য় কমিটি, শৃক্সখলা কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি কমিটি, পরীক্ষা কমিটি ইত্যাদি এরূপ সংগঠনের উদাহরণ।
৫. মেট্রিক্স সংগঠন : মেট্রিক্স সংগঠনকে সংগঠনের আধুনিক রূপ বলা হয়। কার্যভিত্তিক ও দ্রব্যভিত্তিক বিভাগীয়করণের সমš^য়ে যে সংগঠন কাঠামোর মাধ্যমে বৃহদায়তন শিল্পের প্রযুক্তিগত ও কার্যিক জটিলতা নিরসন করা হয় তাকে মেট্রিক্স সংগঠন বলে। এ ধরনের সংগঠনে দুই ধরনের কাজ তদারকির জন্য দুই ধরনের নির্বাহী থাকে। ব্যাপক মাত্রায় কারিগরি জ্ঞান ও উন্নত কলাকৌশলের ব্যবহার লক্ষণীয়, যা ষাটের দশকের প্রথমদিকে বড় ধরনের হাইটেক শিল্পের প্রযুক্তিগত এবং কার্যিক জটিলতা নিরসনকল্পে কার্যভিত্তিক ও দ্রব্যভিত্তিক বিভাগীয়করণের সমš^য় ঘটিয়ে মেট্রিক্স সংগঠন কাঠামোর প্রবর্তন করা হয়।
খ. অনানুষ্ঠানিক সংগঠন : যে সংগঠন কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক নির্দিষ্ট নিয়মকানুন বা রীতিনীতি না মেনে গড়ে ওঠে তাকে অনানুষ্ঠানিক সংগঠন বলে। অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক সংগঠন বলতে প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কর্মরত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠাকে বুঝায়। একসাথে ওঠাবসা, ব্যক্তিগত ভাব বিনিময়, আলাপচারিতা, আঞ্চলিকতা, সামাজিকতা ইত্যাদি থেকে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সাধারণ আনুষ্ঠানিক সংগঠনের ভিতর থেকেই কর্মীদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের সৃষ্টি হয় এবং এ থেকেই আনুষ্ঠানিক সংগঠনের সৃষ্টি হয়।
২. সংগঠন চিত্রের ধরন বিচারে :
ক. সমান্তরাল সংগঠন : যে আনুষ্ঠানিক সংগঠন কাঠামোতে অধস্তন কর্মীর সংখ্যা বেশি হলেও সাংগঠনিক স্তরের সংখ্যা কম হয় এবং চিত্র অনেকটা সমান্তরাল রূপ পরিগ্রহ করে তাকে সমান্তরাল সংগঠন বলে। এরূপ সংগঠনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি নিচের দিকে বিস্তৃত না হয়ে পাশাপাশি বেশি বিস্তৃতি লাভ করে। এ প্রসঙ্গে ইধৎঃড়ষ ধহফ গধৎঃরহ বলেন, ''অ ভষধঃ ংঃৎঁপঃঁৎব ঃযধঃ যধং ভবি যরবৎধৎপযরপধষ ষবাবষং ধহফ রিফব ংঢ়ধহং ড়ভ পড়হঃৎড়ষ.'' অর্থাৎ, কমসংখ্যক সাংগঠনিক স্তর এবং প্রশস্ত নিয়ন্ত্রণ পরিসরযুক্ত কাঠামো হলো সমান্তরাল কাঠামো।
খ. খাড়াকৃতির সংগঠন : যে আনুষ্ঠানিক সংগঠন সাংগঠনিক স্তরের সংখ্যা বেশি হয় এবং একজন নির্বাহী কমসংখ্যক অধস্তন তত্ত¡াবধান করে তাকে খাড়াকৃতির সংগঠন বলে। এরূপ সংগঠনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি পাশাপাশি বেশি বিস্তৃত না হয়ে নিচের দিকে বেশি বিস্তৃতি লাভ করে। এ প্রসঙ্গে ইধৎঃড়ষ ধহফ গধৎঃরহ বলেন, ''অ ঃধষষ ংঃৎঁপঃঁৎব রং ড়হব ঃযধঃ যধং সধহু যরবৎধৎপযরপধষ ষবাবষং ধহফ হধৎৎড়ি ংঢ়ধহং ড়ভ পড়হঃৎড়ষ.'' অর্থাৎ, খাড়াকৃতির সংগঠন হচ্ছে এমন যেখানে সাংগঠনিক স্তরের সংখ্যা বেশি থাকে এবং নির্বাহীর নিয়ন্ত্রণ পরিসর ছোট হয়।
৩. নমনীয়তার ধরন বিচারে :
ক. স্থির সংগঠন : যে সংগঠন কাঠামো স্থির কর্মপরিবেশ বিবেচনা করে দাঁড় করানো হয় তাকে ধ্রæব বা স্থির সংগঠন কাঠামো বলে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সংগঠন কাঠামো পরিবর্তনের কোনো চিন্তা করা হয় না। তাই অনেক চিন্তাভাবনা করে এ ধরনের সংগঠন কাঠামো গড়ে তুলতে হয়। স্থায়ী পরিকল্পনার আলোকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় এমন প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সংগঠন কাঠামো ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
খ. আপেক্ষিক বা অরগানিক সংগঠন : যে সংগঠন কাঠামো পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে পরিবর্তন হতে পারে চিন্তা করে সাজানো হয় তাকে আপেক্ষিক বা অরগানিক সংগঠন বলে। সাধারণত ফরমায়েশভিত্তিক, মৌসুমি ও প্রজেক্টভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে এরূপ সংগঠন কাঠামো ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উক্ত সংগঠনের কাজ সম্পাদনের জন্য চুক্তির ভিত্তিতে জনশক্তি নিয়োগ করা হয়, যাতে যেকোনো সময় সংগঠন কাঠামো পরিবর্তন করা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বৃহদায়তন প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায় জগতে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের সংগঠন কাঠামো করেছে। তবে প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের সংগঠন কাঠামো ব্যবহার করবে তা বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে।