সহকারী অধ্যাপক
০৪ জুন, ২০২৪ ১০:৩২ অপরাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ দ্বাদশ
বিষয়ঃ ইসলাম শিক্ষা ২য় পত্র
অধ্যায়ঃ প্রথম অধ্যায়
এ পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে…
১. মহানবির যুগে আল-কুরআন সঙ্কলন না-করার কারণ;
২. আল-কুরআন সংরক্ষণ কীভাবে হয়েছিল;
৩. আল-কুরআন সংকলনের প্রয়োজনীয়তা;
৪. আল-কুরআন সংকলনের বিস্তারিত বর্ণনা।
বিস্তারিত আলোচনা
আল-কুরআন সংরক্ষণ ও সংকলন
v আল-কুরআন সংরক্ষণ
আল-কুরআন একবারে সম্পূর্ণ অবতীর্ণ হয়নি; বরং পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী খন্ড-খন্ডভাবে ক্রমশ অবতীর্ণ। হয়। ফলে, তা সংরক্ষণের জন্যও সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আল-কুরআন দু’পন্থায় সংরক্ষণ করা হয়; যথা:
এক. স্মৃতিপটে সংরক্ষণ;
দুই. লেখার উপকরণে সংরক্ষণ।
Ø এক. স্মৃতিপটে সংরক্ষণ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি যখন যতটুকু কুরআন অবতীর্ণ হতো, তখন তিনি তা কণ্ঠস্থ করে স্মৃতিপটে সংরক্ষণ করতেন। হযরত জিবরাঈল (আ) ওহী নিয়ে এলে রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত জিহ্বা সঞ্চালন করে তা আত্মস্থ করতেন, যাতে ভুলে না-যান। এ ব্যবস্থা রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য কষ্টসাধ্য ছিল বলে আল্লাহ তা সহজ করে দেন। তাঁর ক্ষেত্রে মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করাটাই যথেষ্ট ছিল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
لا تحرك بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ إِن عَلَيْنَا جَمعَهُ
“(হে মুহাম্মদ (স)! দ্রুত (ওহী) আয়ত্ত করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা তার (জিব্রাঈলের) সঙ্গে সঞ্চালন করবে না। তা সংরক্ষণ ও পাঠ করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তো আমার।” (সূরা কিয়ামাহ : ১৬-১৭)
ü স্মৃতিপটে সংরক্ষণ তিনভাবে হয়; যথা :
(i) মহানবি (স)-এর স্মৃতিতে সংরক্ষণ :
উপর্যুক্ত আয়াত অবতীর্ণের পর থেকে রাসূল (স)-এর নিজের স্মৃতিপটে কুরআন সংরক্ষণের জন্য তেমন বেগ পেতে হয়নি। আল্লাহর আয়াত এলেই তা তাঁর অন্তরে বন্ধমূল হয়ে যেত। তাছাড়া জিবরাঈল (আ) প্রতি রমযান মাসে এসে মহানবী (স) থেকে সে-সময় পর্যন্ত অবতারিত কুরআনের সর্বাংশ শুনতেন। রাসূলুল্লাহ (স) পড়ে শুনাতেন এবং নিজেও তার কাছ থেকে শুনে নিতেন। আল্লাহর এই নিশ্চিদ্র ব্যবস্থাপনায় অবিকলভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তরে কুরআন সংরক্ষিত হতে থাকে ।
(ii) সাহাবিগণের স্মৃতিপটে সংরক্ষণ :
রাসূলুল্লাহ (স) নিজের স্মৃতিপটে কুরআন সংরক্ষণের পাশাপাশি সাহাবিগণের স্মৃতিপটে তা সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। যখনই হযরত জিবরাঈল (আ) আয়াত নিয়ে আসতেন, তখনই তিনি নিজে যেমন মুখস্থ করতেন তেমনি উপস্থিত সাহাবিদের মুখস্থ করার জন্য নির্দেশ দিতেন। সাহাবিগণ দুনিয়ার সবকিছু অপেক্ষা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশ ও কুরআনকে অধিকতর গুরুত্ব দিতেন। তারা বরং অবতীর্ণ আয়াতগুলো লুফে নেয়ার জন্য সদাসর্বদা প্রস্তুত থাকতেন। রাসূল (স) কোন আয়াত নাযিল হওয়ার সংবাদ দিলে তাদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা হতো কে কার আগে কণ্ঠস্ব করতে পারে। অপরিসীম আগ্রহ উদ্দীপনা ও অসামান্য স্মৃতিশক্তির ফলে বহু সাহাবি সর্বশেষ অবতারিত আয়াতসহ পূর্ণ কুরআনের হাফিজ হয়ে ওঠেন। তাঁদের মধ্যে ছিল :
ক. চার খলিফা,
খ. হযরত তালহা,
গ. হযরত সা’দ,
ঘ. হযরত সালিম,
ঙ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ,
ঞ. হযরত আয়েশা,
চ. হযরত মুআবিয়া ও হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়।
iii. আমলের মাধ্যমে সংরক্ষণ
সাহাবিগণ কুরআন কণ্ঠস্থ করে তা আবার অন্যদের শুনাতেন নিজেরা কণ্ঠস্থ আয়াতগুলো অনুযায়ী আমল করতেন, অন্যান্যকে সেভাবে আমল করতে বলতেন। এভাবে অবতীর্ণ আয়াতগুলো ক্রমশ পৌঁছে যেত আরবের প্রতিটি ঘরে ঘরে।
Ø দুই. লেখার উপকরণে সংরক্ষণ
রাসূল্লাহ (স) কেবল নিজে মুখস্থ করে এবং সাহাবিদের দিয়ে মুখস্থ করিয়েই কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব শেষ করেননি; একই সঙ্গে তিনি তা লেখার উপকরণে নিপিবদ্ধ করে রাখারও ব্যবস্থা করেন। আল-কুরআনের যে-অংশ যখনই অবতীর্ণ হতো তিনি সাহাবিদের দিয়ে তা লিখিয়ে রাখতেন। সর্বাবস্থায় যাতে ক্রমাবতীর্ণ কুরআন লিপিবদ্ধ করা যায়, সেজন্য তিনি একদল লেখক সাহাবিকে সদা প্রস্তুত রাখতেন। তাঁরা কালির দোয়াত, কলম ও অন্যান্য লেখার সামগ্রী সঙ্গে রাখতেন। অবাসে-প্রবাসে, যুদ্ধের ময়দানে, মসজিদে সর্বত্রই এই ব্যবস্থা অব্যাহত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন তখন পথেও তিনি ওহী লেখার জন্য হযরত আবু বকর (রা)-কে লেখার উপকরণ সঙ্গে রাখতে আদেশ দিয়েছিলেন। ৬ষ্ট হিজরি সালে হুদায়বিয়াতে যে সন্ধি চুক্তি হয়েছিল, তা লিখিত হয়েছিল কুরআন লেখার জন্য রাসুল্লাহ (স) ও সাহাবিদের সঙ্গে আনা লেখার সামগ্রী দিয়ে। হযরত যায়দ ইবন সাবিত (রা) বলেন : আমি ওহী লিপিবদ্ধ করে রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। যখনই রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি কোনো ওহী অবতীর্ণ হতো, তখন তাঁর শরীরে মুক্তার দানার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যেত। তারপর আমি দুম্বার প্রশস্ত হাড় অথবা অন্য কোনো লেখার উপকরণ নিয়ে উপস্থিত হতাম। লেখা শেষ করার পরে কুরআনের ওজন আমার দেহে অনুভূত হতো, মনে হতো আমার পা যেন ভেঙ্গে পড়েছে। আমি যেন চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। লেখা শেষ হওয়ার পরে রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলতেন, ‘তুমি যা লিখেছ তা পড়ে শোনাও।’ ফলে, আমি যা লিখেছি তা তাঁকে পড়ে শোনাতাম। কোথাও কোনো ভুল হয়ে থাকলে, তিনি তা সংশোধন করে দিতেন। একই সঙ্গে তিনি লিখিত অংশ উপস্থিত লোকদের শুনিয়ে দিতেন।” (তাবারী)।
· লিখার উপকরণসমূহ
কুরআন অবতরণকালে আরবে লেখার কাগজের চরম অভাব ছিল। মুদ্রণযন্ত্রের তো অস্তিত্বই ছিল না। তার বহু শতাব্দী পরে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ফলে, নিম্নলিখিত বস্তুসমূহে অবতারিত আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা হতো :
১. সাদা পাথর ও শিলা;
২. শুকনা চামড়া;
৩. খেজুর বৃক্ষের শাখা, বাঁশের টুকরা ও গাছের পাতা;
৪. পশুর প্রশস্ত হাড় ইত্যাদিতে কুরআন লিখে রাখা হতো;
5. কেউ কেউ আবার দুষ্প্রাপ্য কাগজেও লিখে রাখতেন।
কুরআন সংরক্ষণের জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে অবতীর্ণ আয়াত লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় জানা যায়, তিনি তাঁর বোনের নিকট থেকে কুরআনের এক লিখিত অংশ নিয়ে পাঠ করেন। হযরত আমর ইবন হাফস (রা)-এর নিকট লিখিত কুরআন বিদ্যমান ছিল। রাসূল (স) তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, অপবিত্র অবস্থায় কেউ যেন কুরআন স্পর্শ না করে। এভাবে সম্ভাব্য সকল পন্থায় মহান আল্লাহ আল-কুরআন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন :
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ.
“আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই সংরক্ষণকারী।” (সূরা হিজর : ৯)
আল্লাহ তাআলা যেমন কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহ সংরক্ষণের কথা ঘোষণা করেছেন, তেমনি তিনি কুরআন বহির্ভূত কোনোকিছু আল-কুরআনে অন্তর্ভুক্ত না-হয়, সে আশঙ্কা দূর করে ঘোষণা করেন :
لَّا یَاۡتِیۡهِ الۡبَاطِلُ مِنۡۢ بَیۡنِ یَدَیۡهِ وَ لَا مِنۡ خَلۡفِهٖ ؕ تَنۡزِیۡلٌ مِّنۡ حَکِیۡمٍ حَمِیۡدٍ
এতে বাতিলের (মিথ্যার) কোন অবকাশ নেই। সামনের দিক থেকেও নেই, আর পেছনের দিক থেকেও নেই।
এটি প্রশংসিত, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” (সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ : ৪১-৪২)
o কাতিবে ওহি বা ওহি লেখক
সাহাবিদের মধ্যে কুরআন লেখার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত ছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল ৪২ জন। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন :
(১) হযরত যায়দ ইবন সাবিত (রা);
(২) হযরত উবাই ইবন কা'ব (রা) ।
আরও যারা প্রসিদ্ধতা অর্জন করেন, তাঁরা হচ্ছেন- (১) হযরত আবু বকর (রা), (২) হযরত উমর ফারুক (রা), (৩) হযরত উসমান (রা), হযরত আলী, (৫) হজরত জুবায়র ইবন আওয়াম (রা), (৬) হযরত আব্দুল্লাহ ইবন সা'দ (রা), (৭) হযরত খালিদ ইবন ওয়ালিদ (রা), (৮) হযরত আবান ইবন সাঈদ (রা), (৯) হযরত হানজালা ইবন রাবী (রা), (১০) হযরত আব্দুল্লাহ ইবন সারকাম (রা), (১১) হযরত আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) ও (১২) হযরত মু'আবিয়া (রা) প্রমুখ।
v আল-কুরআন সংকলন
রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওফাতের পরে হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকালে কুরআন সঙ্কলিত হয়। কুরআনকে একটি গ্রন্থে রূপদান করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায় এ কাজটি সম্ভব ছিল না। কারণ তাঁর জীবদ্দশায় ক্রমাগতভাবে কুরআন নাযিল হচ্ছিল। কুরআন নাযিল বন্ধ হলেই কেবল সম্পূর্ণ কুরআনের সঙ্কলন তৈরি করা সম্ভব। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওফাত দ্বারা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়েছে যে, কুরআনের সর্বাংশ নাযিল হয়েছে।
§ আল-কুরআন সংকলনের প্রয়োজননীয়তা : আল-কুরআন সংকলনের প্রয়োজনীয়তাগুলো নিম্নরূপ :
o হাফিযদের শাহাদাতবরণ :
রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওফাত পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যেই ইয়ামামার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ৭০ জন কূরআনের হাফিয শাহাদাতবরণ করেন। ফলে, হাফিযদের ইন্তেকালে শঙ্কা দেখা দেয়; এভাবে অন্যান্য যুদ্ধেও হাফিযদের এভাবে শাহাদাত ঘটলে কুরআনের কোনো কোনো অংশ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। ফলে, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সাহাবি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) কুরআন সঙ্কলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি খলিফা হযরত আবু বকর (রা)-কে করআনের বিক্ষিপ্ত পাণ্ডুলিপিসমূহ একত্রিত করে একখন্ডে বিন্যস্ত করতে অনুরোধ করেন। গ্রন্থাকারে সঙ্কলনের কাজটি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) করে যাননি বলে হযরত আবু বকর (রা) প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও পরক্ষণেই বাস্তবতা উপলব্ধি করে রাজি হয়ে যান। তিনি হযরত যায়েদ ইবন সাবিত (রা)-কে এ মহৎ দায়িত্ব অর্পণ করেন।
µ মহানবি (স)-এর সময়ে সংরক্ষিত কপিসমূহ হজরত আবু বকর (রা) কর্তৃক সংগ্রহ :
হযরত যায়দ ইবন সাবিত (রা) সততা ও নিষ্ঠার সাথে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। হজরত আবু বকর (রা) রাসুলুল্লাহ (স)-এর যামানায় কুরআনের যাবতীয় পাণ্ডুলিপি হযরত যায়দ ইবন সাবিত (রা)-এর নিকট জমা করার ফরমান জারি করেন। তিনি নিজে হাফিয ছিলেন, তার নিজের লিখিত কুরআনের কপি ছিল। কিন্তু তিনি তার উপর নির্ভর করেননি, বরং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে লিখিত কুরআনের সর্বপ্রকার কপি এবং হাফিযদের হিফযের উপর নির্ভর করেছিলেন। হযরত যায়দ ইবন সাবিত তাঁর দায়িত্ব পালনে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেন তা হচ্ছে :
1. তিনি তার স্মৃতি ও কপিতে রক্ষিত কুরআনের সঙ্গে অন্যান্য কপিগুলো যাচাই-বাছাই করেন;
2. হযরত উমর (রা)-সহ বহু ওহী লেখক তার কাজে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন;
3. কোনো কপিই কুরআন বলে তিনি স্বীকার করতেন না, যতক্ষণ না দু'জন বিশ্বস্ত লোক সাক্ষ্য দিতেন যে, তাঁরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল।
4. সংগৃহীত কপিগুলোর সঙ্গে হাফিযদের স্মৃতিতে রক্ষিত কুরআনের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই-বাছাই করা হয়। সংগৃহীত ও হাফিযদের স্মৃতিপটে রক্ষিত সূরা ও আয়াতসমূহ পরস্পর সমন্বয় সাধন করে একটি ‘মাসহাফ’ (পাণ্ডুলিপি) প্রস্তুত করা হয়।
এভাবে তিনি যে ‘মাসহাফ’ প্রস্তুত করেন, তা রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক বিন্যস্ত অবিকল কুরআন। এতে কোনো প্রকার পরিবর্তন করা হয়নি। বরং হাফিযদের হৃদয়পটে সুরক্ষিত বিন্যাসের সঙ্গে মিল রেখে বিক্ষিপ্তাকারে লিপিবদ্ধ কপিগুলোর সুসামঞ্জস্য সাধন করা হয়। হযরত যায়েদ (রা) কর্তৃক এই মূল কপিটি 'মাসহাফ' নামে পরিচিত। নামটির প্রস্তাবক ছিলেন, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)। এটি হযরত আবু বকর (রা)-এর কাছে রক্ষিত ছিল। হযরত উমর (রা) খলিফা হলে, তা তার হেফাযতে আনীত হয়। তাঁর শাহাদাতের পর কপিটি তাঁর কন্যা ও মহানবী (স)-এর স্ত্রী হযরত হাফসা (রা)-এর নিকট রক্ষিত থাকে।
খোলাফায়ে রাশেদীনের যামানায় ইসলাম আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে অনারব বিশ্বে দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে লোক ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। তাদের আরবি কুরআন পড়তে গিয়ে বেশকিছু সমস্যার তথা কিরাআত নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি হয়। এতে আঞ্চলিক ভাষা ও বিভিন্ন উচ্চারণের প্রভাবে কুরআন পঠনে মতভেদ দেখা দেয়। এতে সেনাপতি হুজায়ফা (রা) হজরত উসমান (রা)-কে সমস্যার আশু সমাধানের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন। খলিফা তাঁর কথার যৌক্তিকতা উপলব্ধি করে তার অনুরোধে সাড়া প্রদান করেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হযরত উসমান (রা) হযরত আবু বকর (রা)-এর যামানায় প্রস্তুতকৃত 'মাসহাফ' থেকে বহুকপি তৈরি করে প্রদেশগুলোতে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি এ কাজের দায়িত্ব প্রদান করেন :
1. হযরত যায়দ ইবন এ সাবিত (রা),
2. হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যুবায়ের (রা),
3. হযরত সাঈদ ইবনুল আস (রা),
4. হযরত আব্দুর রহমান ইবনুল হারিছ (রা)-কে।
তিনি চারজনের এই পরিষদকে হযরত হাফসা (রা)-এর কাছে গচ্ছিত মূল মাসহাফ থেকে বহুকপি করার ভার অর্পণ করেন এবং কিরাআতে মতবিরোধ হলে কুরায়শী কিরাআতরীতিকে গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন। এভাবে কুরায়শী কিরআত পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়ে মূল মাসহাফের বহুকপি করা হয় এবং তা বিভিন্ন প্রদেশে প্রেরণ করা হয় এবং সকল মুসলিমকে এই কুরআনের অনুসরণ করতে বলা হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত কুরআন হযরত আবু বকর (রা)-এর যামানায় গ্রন্থিত ও হযরত উসমান (রা)-এর যামানায় কপিকৃত কুরআনেরই প্রতিলিপি ।
হজরত মুহাম্মদ (স)-এর ওফাতের পূর্বেই কুরআন মাজীদের সুরা ও আয়াতগুলোর ক্রমবিন্যাস সুনির্দিষ্ট ছিল। আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে রাসূল (স)-কে কুরআনের ক্রমধারা জ্ঞাত করেছেন। রাসূল (স) সাহাবাদের দিয়ে সে অনুসারেই সূরা ও আয়াতসমূহ সুবিন্যস্ত করেছেন।
আল্লামা সুয়ূতী (র) বলেন : "কুরআনের সূরাসমূহের আয়াতগুলোর ক্রমধারা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (স)-কে অবগত করানোর পর সুবিন্যস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই।"
· কোন আয়াত বা সূরার পরে কোন আয়াত বা সূরা হবে, তা রাসূল (স)-এর জীবদ্দশায়ই প্রতি বছর রমযানে হযরত জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-কে নির্দেশ করতেন এবং ক্রমানুসারে পাঠ করে শোনাতেন। রাসূলুল্লাহ (স) নির্ধারিত ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী মুখস্থ করেছিলেন।
· মাসহাফে উসমানীতে নুকতা এবং হরকত সংযোজিত ছিল না। এতে অনারবদের কুরআন পাঠে অসুবিধা হতো।
· হযরত আলী (রা)-এর উদ্যোগে প্রখ্যাত তাবেঈ আবুল আসওয়াদ দুয়ালি (র) কুরআনে নুকতা সংযোজন করেন।
· আল-কুরআনে হরকত সংযোজন করা হয়, ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের উদ্যোগে।
ü আল-কুরআন মুদ্রণ
v মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বেই মুসলিমদের উদ্যোগে কুরআনের লক্ষ লক্ষ হাতে লেখা কপি তৈরি হয়েছিল।
q মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ 'হিংক্যালম্যান' হ্যামবুর্গ শহরে সর্বপ্রথম কুরআন মুদ্রণের কাজ সমাপ্ত করেন।
ü মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম মাওলায়ে উসমান (র) কুরআন মুদ্রণের গৌরব অর্জন করেন। তিনি ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার 'সেন্ট পিটার্স' শহরে ইসলামি ছাপাখানায় কুরআন মুদ্রণের কাজ সম্পন্ন করেন।
Ø ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ইরানের 'তেহরান’ ও 'তিবরীয' শহরে মুসলিমদের উদ্যোগে আল-কুরআন মুদ্রিত হয়।
o ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে প্রাচ্যবিদ মি. ফ্লুবিল 'লিপযিগ' শহরে কুরআন মুদ্রণ কাজ সম্পন্ন করেন।
§ এর কিছুদিন পরে পাক-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকবার কুরআন মাজীদ মুদ্রিত হয়।
§ এর পরে পৃথিবীর সর্বত্রই কুরআন মুদ্রণের কাজ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে।