সহকারী প্রধান শিক্ষক
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৭:৩৫ অপরাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
নেতৃত্বের গল্প (ঝরেপড়া এক অদম্য শিক্ষার্থীর পড়াশুনায় ফিরে এসে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন)
আগের গল্পগুলোতে লিখেছিলাম একজন সাধারণ শিক্ষকের মতো আমি সকালের বিশেষ ক্লাসে ৩টি ও স্কুলে ২টি মোট ৫টি ক্লাস প্রতিদিন নিয়ে থাকি। ৬ষ্ঠ শ্রেণির হোসাইন আহমদ নামের এক শিক্ষার্থীর কেস স্টাডি নিয়ে আজকের গল্প। দেখলাম উল্লেখিত শিক্ষার্থী খুব মেধাবী নয় কিন্তু বিনয়ী এবং আচরণ গুলোও অন্য শিক্ষার্থীর চাইতে একটু আলাদা। স্কুলে ও স্কুলের ক্লাসে সে অনিয়মিত। সকালের বিশেষ ক্লাসে মোটামুটি উপস্থিত থাকে। আমি তার খুব কাছে গেলাম, বিস্তারিত জানার চেষ্টা করলাম।
তাকে কিভাবে একটু ভাল করা যায় ও স্কুলে নিয়মিত আনা যায় তার জন্য কিছু প্রচেষ্টা শুরু করলাম। তার প্রথমে ছিল ওর সাথে খুব মিল দেই, পারিবারিক বিষয় জানতে চাইতাম ক্লাসে ফাঁকে। সে প্রথমে বলতে চায়নি। কয়েকদিন পর সে কিছুটা ইজি হয়ে গেল এবং শেয়ার করলো।
হোসাইন আমাকে জানায় ৫ম শ্রেণিতে কোন মতে পড়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে আমার স্কুলে। কিন্তু তার পড়াশুনা করা সম্ভব নয়, এই আশংকায় থাকে সবসময়। কারণ সে স্কুলে পার্শ্ববতী বাজারে একটি দর্জি দোকানে কাজ করে, সহকারী টেইলার হিসাবে। সেখানে কিছু টাকা পায় তা সংসারের কাজে খরচ করে। ছুটি খুব কম। কোন কোন সময় পরীক্ষার সময়েও ছুটি কাটানো দুস্কর। এতে তার কাজ ও পড়াশুনা কোনটাই ভাল হচ্ছেনা বিধায় সে শংকিত।
আবার স্কুলে বিশেষ ক্লাসে আসলে স্কুল ছুটি পর্যন্ত থাকতে হয় অর্থাৎ ৪টা পর্যন্ত। ছুটির পর বাড়ি গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে দোকানে গেলে তখন কর্মঘন্টা তেমন থাকে না। আবার সকালের বিশেষ ক্লাস তার খুব প্রয়োজন, কেননা প্রাইভেট পড়ার বা কোচিং এর সামথ্য তার নাই। কিন্তু আশা এনজিওর তত্ত্বাবধানের বিশেষ ক্লাসে মাত্র ১০০(একশত)টাকা দিয়ে সে ৩টি বিষয় পড়তে পারে, এজন্য এই সুবিধা তার খুব দরকার। আবার স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে সে বিশেষ ক্লাসে সুবিধা পাবেনা, এটা তার জন্য একটা শর্ত।
আমি বিস্তারিত জানার পর তাকে সাহস দিলাম, প্রয়োজনে ছুটি দেয়ার আশ্বাস দিলাম তবে তা আমার অনুমতি সাপেক্ষে। তাকে পড়াশুনায় একটু বেশি মনোযোগ দিতে বললাম। এমন কাজ সে পরেও করেতে পারবে, কিন্তু স্টাডি থেকে ড্রপ আউট হলে, রেজিঃ থেকে বঞ্চিত হলে সে আর পড়াশুনা করতে পারবে না। এগুলো বোঝানোর চেষ্টা করলাম। দর্জির গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো দ্রুত শেখার তাগিদ দিলাম।
হোসাইন যেখানে কাজ করে সেই টেইলার্সে কথা বলার উদ্দ্যোগ নিলাম (শেষ পর্যন্ত কথা বলতে হয়নি)। সুবিধামতো সময়ে তাকে একটি সেলাই মেশিন কিনে দিব মর্মেও আশ্বস্থ করলাম। হোসাইন ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী হয়েও পড়াশুনা ধরে রেখে মেয়েদের সকল ধরণের পোষাক তৈরি করতে পারে, ছেলেদের জামা প্যান্ট শেলাই করতে পারে।
অভিভাবক মতবিনিময় সভায় তার এই প্রতিভার জন্য ‘সেরা
অদম্য শিক্ষার্থী’র পুরস্কার দিলাম। পুরস্কার হিসাবে স্কুল ব্যাগ দিলাম, তার মায়ের
হাতে তুলে দিলাম, মা সন্তানের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন। দৃশ্যটা আমার জীবনে
শ্রেষ্ঠ একটি দৃশ্য। যে সন্তান সর্বত্র ধমক, আর শাসন বাদে কিছুই শোনে নাই সে আজ
সেরা অদম্য শিক্ষার্থীর পুরস্কারে পুরস্কৃত। সকল শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সামনে তাকে
পোষাক তৈরির কাজ দেয়ার অনুরোধ জানালাম। যখন অভিভাবকরা কিছুই জানেন না যে তাদের
সন্তানরা স্কুলে কি করছে, সেখানে আমি অভিভাবক ডেকে তাঁদের হাতে তাঁর সন্তানের
পুরস্কার তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করলাম।
আজ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ সবচে আনন্দের বিষয় হোসাইন আহমদ,
যে ঝড়ে পরা শিক্ষার্থী ছিল সে আজ বার্ষিক পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৩য় স্থান অর্জন করে
৭ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। প্রতি বিষয়ে ৬০ শতাংশের উপরে নম্বর পেয়েছে।
সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসাবে বেশিরভাগ সময় অনেকের মন রাখতে পারি না, পারা যায় না। তবে কিছু কোমলমতি শিক্ষার্থীকে তাদের পড়াশুনার ট্রেকে রাখতে পেরেছি, পড়াশুনায় ধরে রাখতে কিছুটা অবদান রাখতে পেরেছি এই ভেবে আমি আনন্দিত।
লোকাল শিক্ষকবৃন্দ, ও এলাকাবাসী জানবেন আমার সান্দিকোনা
উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে চারদিকে ৫টি প্রতিষ্ঠিত কিন্ডাগার্টেন ঘিরে রেখেছে যারা
সবাই প্লে থেকে ১০ পর্যন্ত পাঠদান করেন। এমন অবস্থায় একটি এমপিওভূক্ত প্রতিষ্ঠানে
ভাল পাঠদান, ভাল ফলাফল, ভাল শিক্ষার্থী ভর্তি ও ড্রপআউট কমানো যে কোন স্কুল, শিক্ষক,
প্রধান শিক্ষকের জন্য চ্যালেঞ্জিং। ফল কি হবে না ভেবে আমার প্রচেষ্ঠা আমি করে যাচ্ছি যার
সহযাত্রী আমার সম্মানিত সহকর্মীবৃন্দ। তাঁদের উৎসাহ অনুপ্রেরণা আর এলাকার কিছু
ইতিবাচক মনের অভিভাবক, নেতৃবৃন্দের সহানুভূতিই আমার কাজ করা শক্তি।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু পারেন আজ এটা আবারো
প্রতিষ্ঠিত হলো। অভিভাবক সভায় এই অদম্য শিক্ষার্থী তার বাস্তবতা নিয়ে একটি বক্তব্য
দিয়েছিল। ভিডিওতে সেই বক্তব্য আছে, শুনার অনুরোধ রইল।
www.sumbk.edu.bd এটি আমার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট। এই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ভিডিও লিংক এবং ফটোগ্যালারী ভিজিট করলে প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত জানতে পারবেন। শিক্ষক বাতায়ন ও তার কারিগর এটুআইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আমার এই স্টোরী আপলোডের সুযোগ দেয়ার জন্য।
মো: আনোয়ার উদ্দীন হিরন
সহকারী প্রধান শিক্ষক
সান্দিকোনা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
কেন্দুয়া, নেত্রকোণা।
01711129709
30.12.2024