সহকারী শিক্ষক
০৩ জুলাই, ২০২৫ ০৬:৫৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ নবম
বিষয়ঃ ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান
অধ্যায়ঃ অধ্যায় ১
অবশ্যই। পূর্ব বাংলার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের উত্থান (১৯৪৭-১৯৭০) ছিল বাঙালি জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ২৩ বছরের শোষণ, বঞ্চনা ও সংগ্রামের পথ ধরেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়েছিল।
নিচে এই সময়ের মূল ঘটনা ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হলো:
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের একটি অংশে পরিণত করা হয়, যা পরিচিতি পায় "পূর্ব পাকিস্তান" নামে। কিন্তু শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়। এর বিরুদ্ধেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন।
১. ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-১৯৫২):
বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষের প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ধাপ ছিল ভাষা আন্দোলন।
প্রেক্ষাপট: পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬% বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
ঘটনাপ্রবাহ: ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা করেন, "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।" এর বিরুদ্ধে तत्काल প্রতিবাদ শুরু হয়। আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন।
ফলাফল: এই আত্মত্যাগের ফলে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সফল প্রতিরোধ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপনকারী ঘটনা।
২. যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন (১৯৫৪):
এটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম গণতান্ত্রিক বিজয়।
প্রেক্ষাপট: মুসলিম লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো (আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি ইত্যাদি) মিলে "যুক্তফ্রন্ট" গঠন করে।
ফলাফল: শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ২১-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ভূমিধস বিজয় (২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৮টি) অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এই ঘটনা বাঙালির মনে গণতন্ত্রের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের অশ্রদ্ধার বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলে।
৩. সামরিক শাসন ও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ (১৯৫৮-১৯৬২):
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন এবং মৌলিক গণতন্ত্রের নামে একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এর বিরুদ্ধেও ছাত্র সমাজ রুখে দাঁড়ায়।
শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২): আইয়ুব খানের শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে ছাত্ররা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। এই রিপোর্টে শিক্ষাকে ব্যয়বহুল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ ছিল। ছাত্রদের প্রবল আন্দোলনে সরকার এই রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
৪. ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬):
এটি ছিল বাঙালি জাতির "মুক্তির সনদ" (ম্যাগনা কার্টা)।
প্রেক্ষাপট: অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য চরমে পৌঁছালে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
গুরুত্ব: ছয় দফার মাধ্যমে বাঙালি জাতি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হয়ে ওঠে এবং এটিই ছিল স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতার দিকে যাত্রার মূল চালিকাশক্তি। আইয়ুব সরকার একে "বিচ্ছিন্নতাবাদী" আখ্যা দিয়ে কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করে।
৫. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৬৮):
ছয় দফা আন্দোলনকে দমন করতে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করে, যা "আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা" নামে পরিচিত।
ফলাফল: এই মামলা বাঙালির মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তারা বুঝতে পারে যে, এটি ছিল বাঙালি নেতৃত্বকে ধ্বংস করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়।
৬. উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯):
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে এবং সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন একসময় গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
ঘটনাপ্রবাহ: ছাত্র সংগ্রাম কমিটির ১১-দফা এবং বঙ্গবন্ধুর ৬-দফার ভিত্তিতে এই আন্দোলন তীব্র হয়। ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক (মামলার অন্যতম আসামি) নিহত হলে আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
ফলাফল: প্রবল গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল অভিযুক্ত নিঃশর্ত মুক্তি পান। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল ছাত্র-জনসভায় শেখ মুজিবকে "বঙ্গবন্ধু" উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
৭. সত্তরের সাধারণ নির্বাচন (১৯৭০):
আইয়ুব খানের পতনের পর নতুন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
ফলাফল: ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে আওয়ামী লীগ। এই ফলাফল ছিল ছয় দফার প্রতি বাঙালির পূর্ণ সমর্থনের প্রমাণ।
সংকট: নির্বাচনে জয়লাভ সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করে। তারা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেয়।
১. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়া এবং রবীন্দ্রসংগীত, পহেলা বৈশাখসহ বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শাণিত করে।
২. অর্থনৈতিক বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানের পাট, চা ইত্যাদি রপ্তানি করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। বাজেটের বেশিরভাগ অংশ পেত পশ্চিম পাকিস্তান, যা পূর্ব বাংলাকে একটি অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত করেছিল।
৩. রাজনৈতিক শোষণ: জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও শাসনক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নীতি নির্ধারণে বাঙালির কোনো ভূমিকা ছিল না।
৪. প্রশাসনিক ও সামরিক বৈষম্য: সেনাবাহিনী, সরকারি আমলাতন্ত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে বাঙালির প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত এই ২৩ বছরের সংগ্রাম ছিল মূলত শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম হয়েছিল, তা ছয় দফা ও উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে সত্তরের নির্বাচনে পূর্ণতা পায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে अस्वीकार করল, তখন বাঙালির সামনে সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়।