সহকারী শিক্ষক
০৭ জুলাই, ২০২৫ ০৩:১১ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ নবম
বিষয়ঃ ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান
অধ্যায়ঃ অধ্যায় ১
অবশ্যই! ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
ভাষা আন্দোলন কেবল একটি দিনের ঘটনা ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রাম। এর প্রেক্ষাপটকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়:
দ্বিজাতি তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা: ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু নবগঠিত এই রাষ্ট্রের দুটি অংশের (পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান) মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল প্রায় ১২০০ মাইল। দুই অংশের মানুষের মধ্যে ধর্ম ছাড়া ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার কোনো মিল ছিল না।
জনসংখ্যার হিসাব: পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬% ছিল পূর্ব বাংলার মানুষ এবং তাদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে উর্দু, সিন্ধি, পশতু, বেলুচ ইত্যাদি ভাষা প্রচলিত ছিল। উর্দু ছিল সমগ্র পাকিস্তানের মাত্র ৩-৪% মানুষের মাতৃভাষা।
উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা: জনসংখ্যার বিশাল অংশ বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতারা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করেন। তারা মনে করতেন, উর্দু "ইসলামি সংস্কৃতির" প্রতীক এবং এটিই পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখবে। এই সিদ্ধান্ত পূর্ব বাংলার মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়।
মুদ্রা, ডাকটিকিট, মানি অর্ডার ফর্ম, সরকারি নথিপত্র থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে কেবল ইংরেজি ও উর্দু ব্যবহার শুরু হয়।
পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষাতেও বাংলাকে উপেক্ষা করা হয়।
নৌবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায়ও বাংলাকে বাদ দেওয়া হয়।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বাংলা ভাষাকে অবদমন করতে চাইছে।
তমদ্দুন মজলিশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ‘তমদ্দুন মজলিশ’ নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনটিই সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করে এবং ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে।
গণপরিষদে প্রথম দাবি: ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানান। তিনি বলেন, যেহেতু পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ বাঙালি, তাই গণপরিষদের কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাতেও লেখা উচিত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা তার এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেন।
ভাষা আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফর।
রেসকোর্স ময়দানের ঘোষণা: ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভায় জিন্নাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, "Urdu, and only Urdu shall be the state language of Pakistan" (উর্দু, এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)। উপস্থিত ছাত্র-জনতা তাৎক্ষণিকভাবে "না, না" বলে এর প্রতিবাদ জানায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ: ২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করলে ছাত্ররা আবারও তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং সভাস্থল ত্যাগ করে।
এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজ এবং বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে পারেন যে, আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায় সম্ভব নয়, রাজপথের আন্দোলনই একমাত্র পথ।
ভাষা বিতর্কটি কেবল সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ছিল না, এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ।
রাজনৈতিক: শাসনব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, এবং সরকারি উচ্চপদে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য।
অর্থনৈতিক: পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও চা রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। পূর্ব পাকিস্তানকে фактически একটি উপনিবেশে পরিণত করা হয়েছিল।
এই বৈষম্যের কারণে বাংলা ভাষার দাবিটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাঙালিদের সামগ্রিক অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণা: ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় পাকিস্তানের तत्कालीन প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন (যিনি নিজে একজন বাঙালি ছিলেন) জিন্নাহর কথার পুনরাবৃত্তি করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন।
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন: এই ঘোষণার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করে এবং ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এই পরিষদ ২১শে ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
১৪৪ ধারা জারি ও ভঙ্গ: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা (সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ) জারি করে। কিন্তু ছাত্ররা ২১শে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই প্রেক্ষাপটেই ২১শে ফেব্রুয়ারির সেই ঐতিহাসিক মিছিলটি শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং ভাষা আন্দোলনকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
সারসংক্ষেপ: ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক মনোভাব, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের জেগে ওঠার এক সম্মিলিত প্রয়াস। বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামটি ধীরে ধীরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে চালিত করে।