সহকারী শিক্ষক
১০ জুলাই, ২০২৫ ০৫:৪১ অপরাহ্ণ
নিজের গ্রাম, নিজের দায়: এক সাহসী নেতৃত্বের গল্প
গল্পটি শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের এক বর্ষার দিনে...
আমাদের গ্রামের নামটি হয়তো দেশের মানচিত্রে খুব বড় করে লেখা নেই, তবে এর মানুষগুলো স্বপ্ন দেখে, সংগ্রাম করে, এবং নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই খুঁজে নেয়। সেই বছরটিতে আমাদের গ্রামে বড় একটি সংকট দেখা দেয়—বেশিরভাগ রাস্তা ছিল কাঁচা, কর্দমাক্ত এবং বর্ষার মৌসুমে একেবারেই চলাচলের অযোগ্য।
স্কুলপড়ুয়া ছাত্রদের পায়ে কাদা, রোগী পরিবহন করতে গিয়ে বিপদ, বাজারে যাওয়া তো যেন একপ্রকার যুদ্ধ—এসব যেন গ্রামের মানুষের জীবনের এক স্বাভাবিক চিত্র হয়ে উঠেছিল।
আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেছি। চেয়ারম্যান, মেম্বার, এমনকি সংসদ সদস্যের দপ্তরেও গেছি একাধিকবার। কেউ বলেছে, বাজেট নাই। কেউ আশ্বাস দিয়েছেন—‘আগামী বছর কাজ হবে।’ কিন্তু বছর গড়িয়েছে, কথা পাল্টেছে, রাস্তার অবস্থা আগের মতোই থেকেছে।
এই অবস্থায় অনেকেই হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনই একজন মানুষ এগিয়ে এলেন, যিনি শুধু নেতৃত্ব দেননি, আশাও দিয়েছেন—তিনি জনাব রোকনুজ্জামান রোকন ভাই।
তিনি আমাদের গ্রামেরই সন্তান, এবং তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলের ভিপি ছিলেন। গ্রামে এলেই তিনি সকলের খোঁজখবর নিতেন, সমস্যাগুলো উপলব্ধি করতেন মন থেকে।
একদিন গ্রামের এক আড্ডায় তিনি বললেন—
“আমরা কি শুধু অপেক্ষা করেই যাবো? এই রাস্তা তো আমাদের, এই গ্রামও আমাদের। তাহলে কেন আমরা নিজেরা কিছু করবো না?”
তার কথায় যেন সবাই নতুন করে ভাবতে শেখে। গ্রামের তরুণদের তিনি আহ্বান জানালেন। উৎসাহ দিলেন। নেতৃত্ব দিলেন। কাজের পরিকল্পনা করলেন।
এগিয়ে এল একের পর এক মানুষ
রোকন ভাইয়ের নেতৃত্বে শুরু হলো এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। গ্রামের যুবকেরা হাতে কোদাল নিল, বড়রাও বসে থাকেননি। কেউ বাঁশের ব্যারিকেড তৈরি করলেন, কেউ ড্রেনেজের ব্যবস্থা করলেন, আবার কেউ বস্তায় মাটি ভরে এনে রাস্তায় বিছিয়ে দিলেন।
রাস্তা সংস্কারের কাজটা কোনো আনুষ্ঠানিক প্রকল্প ছিল না, ছিল না কোনো চুক্তি, বরাদ্দ বা সরকারী অনুমোদন।
এটা ছিল "নিজের গ্রাম নিজের দায়"—এই চেতনার বাস্তব রূপ।
দিন-রাত শ্রম দিয়ে তৈরি হলো এমন একটি রাস্তা, যা বর্ষার মৌসুমেও ব্যবহারযোগ্য।
চোখে জল নিয়ে একজন বয়স্ক গ্রামবাসী বলেছিলেন—
“জীবনে প্রথম দেখলাম, নিজেরা কিছু করে রাস্তার কাদা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।”
এই গল্পের অন্তরালে যা রয়ে যায়...
এটা শুধু একটি রাস্তা সংস্কারের গল্প নয়।
এটা নেতৃত্বের, ঐক্যবদ্ধতার এবং দায়বদ্ধতার গল্প।
-
একজন তরুণ নেতা কিভাবে একটি সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তুলতে পারেন, তার বাস্তব উদাহরণ এটি।
-
যখন সবাই এক হয়ে কোনো কাজের দায়িত্ব নেয়, তখন সীমিত সম্পদ দিয়েও অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়।
আমাদের বিশ্বাস, নেতৃত্ব মানে পদ নয়—মনোভাব।
রোকন ভাই আমাদের শিখিয়েছেন, নিজের মাটিকে ভালোবাসতে হলে বড় পদের প্রয়োজন নেই—প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং সাহসিকতার।
উপসংহার:
আজও যদি কেউ আমাদের গ্রামে আসে এবং সেই রাস্তায় হেঁটে যায়, তাহলে হয়তো বুঝতে পারবে না এই রাস্তার পেছনে কতটা ঘাম, শ্রম আর ভালোবাসা রয়েছে।
কিন্তু আমরা জানি, এ পথ শুধু চলার পথ নয়—এটি একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজের আত্মনির্ভরতার প্রতীক।
মূল বার্তা:
"ঐক্যবদ্ধ সমাজ কখনো মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকে না, নিজেরাই পথ গড়ে নেয়।"