Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

২১ জুলাই, ২০২৫ ০৭:০১ পূর্বাহ্ণ

সুরা নাস অর্থসহ ব্যাখ্যা

সূরা নাস (আরবি: سورة الناس‎‎) পবিত্র কুরআনের ১১৪তম এবং সর্বশেষ সূরা। এটি ৬টি আয়াত নিয়ে গঠিত। নাস শব্দের অর্থ হলো "মানবজাতি"। এই সূরায় আল্লাহ তায়ালা শয়তান ও মানুষের কু-প্ররোচনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

সূরা নাসের আয়াত ও অর্থ

১. قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ

অর্থ: বলো, "আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের প্রতিপালকের।"

২. مَلِكِ النَّاسِ

অর্থ: "মানুষের অধিপতির।"

৩. إِلَهِ النَّاسِ

অর্থ: "মানুষের উপাস্যের।"

৪. مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ

অর্থ: "তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্মগোপন করে।"

৫. الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ

অর্থ: "যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।"

৬. مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ

অর্থ: "জিনদের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।"

সূরা নাসের ব্যাখ্যা

সূরা নাস এবং এর পূর্ববর্তী সূরা ফালাক্বকে একত্রে "মু'আওবিযাতাইন" বলা হয়, যার অর্থ আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দুটি সূরা। এই দুটি সূরা বিশেষভাবে যাদু, বদনজর, এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পাঠ করা হয়।

প্রথম তিনটি আয়াত:

প্রথম তিনটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নিজেকে মানুষের তিনটি বিশেষ পরিচয়ে উল্লেখ করেছেন:

 * মানুষের প্রতিপালক (রাব্বিন নাস): এর মাধ্যমে আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন যে, তিনিই সমগ্র মানবজাতির লালন-পালনকারী, প্রশিক্ষণদাতা ও প্রতিপালক। মানুষ তার লালন-পালন ও প্রশিক্ষণের জন্য সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল।

 * মানুষের অধিপতি (মালিকিন নাস): এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, সকল সৃষ্টির উপর আল্লাহর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও মালিকানা রয়েছে। মানুষ আল্লাহর দাস এবং তাঁর সকল বিধি-বিধান ও নির্দেশ মানতে বাধ্য।

 * মানুষের উপাস্য (ইলাহিন নাস): এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে, তিনিই একমাত্র উপাসনার যোগ্য সত্তা। মানুষ কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং অন্য কারো উপাসনা করবে না।

এই তিনটি পরিচয় উল্লেখ করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, যখন আমরা আশ্রয় চাইব, তখন আমরা এমন এক সত্তার কাছে আশ্রয় চাইছি যিনি আমাদের প্রতিপালক, আমাদের মালিক এবং আমাদের একমাত্র উপাস্য। তাঁর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব এতটাই ব্যাপক যে, কোনো ক্ষতি বা অনিষ্ট তাঁর আশ্রয় থেকে মুক্ত হতে পারে না।

শেষ তিনটি আয়াত:

শেষ তিনটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

 * "মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস" (তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্মগোপন করে): এখানে "ওয়াসওয়াস" অর্থ হলো কুমন্ত্রণা বা প্ররোচনা, আর "খান্নাস" অর্থ হলো আত্মগোপনকারী বা পিছিয়ে যাওয়া। শয়তান মানুষের মনে গোপনে কুমন্ত্রণা দেয়, আর যখন আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়, তখন সে পিছিয়ে যায় বা আত্মগোপন করে। এই আয়াতটি শয়তানের কুমন্ত্রণার প্রকৃতিকে বর্ণনা করে – সে লুকিয়ে থেকে মানুষের মনে সন্দেহ ও খারাপ চিন্তার সৃষ্টি করে।

 * "আল্লাযী ইউওয়াসবিসু ফী সুদূরিন্ না-স" (যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়): শয়তান সরাসরি মানুষের উপর আক্রমণ করে না, বরং তাদের মনে সন্দেহ, লোভ, হিংসা, ক্রোধ ইত্যাদি খারাপ চিন্তা ঢুকিয়ে দেয়, যা মানুষকে মন্দ কাজের দিকে প্ররোচিত করে। এই কুমন্ত্রণা এতটাই সূক্ষ্ম হয় যে, অনেক সময় মানুষ বুঝতেও পারে না যে এটি শয়তানের প্ররোচনা।

 * "মিনাল জিন্নাতি ওয়ান্নাস" (জিনদের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে): শয়তান কেবল জিন জাতি থেকেই আসে না, মানুষ রূপী শয়তানও রয়েছে। কিছু মানুষ তাদের খারাপ উপদেশ, মন্দ কাজ বা প্ররোচনার মাধ্যমে অন্য মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়িয়ে দেয়। যেমন, কিছু লোক সমাজে বিভেদ, শত্রুতা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, যা শয়তানেরই কাজ। এই আয়াতটি মানুষকে জিন ও মানুষ উভয় প্রকার শয়তানের অনিষ্ট থেকে সতর্ক করে।

গুরুত্ব ও ফজিলত

 * শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষা: সূরা নাস মূলত শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং মানুষের মন্দ প্রভাব থেকে সুরক্ষা চাওয়ার একটি দোয়া। এই সূরাটি পাঠের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং তাঁর সাহায্য কামনা করে।

 * জাদু ও বদনজর থেকে নিরাময়: বিভিন্ন হাদিসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অসুস্থ হলে অথবা ঘুমানোর আগে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে নিজের হাতে ফুঁক দিয়ে শরীরের যতটুকু সম্ভব মাসাহ করতেন। এক ইহুদি রাসূল (সাঃ)-এর উপর জাদু করলে, জিবরাঈল (আঃ) এর নির্দেশে সূরা ফালাক ও নাস পাঠ করে রাসূল (সাঃ) সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছিলেন।

 * দৈনিক আমল: ফজর ও মাগরিবের নামাজের পর এবং ঘুমানোর আগে এই সূরাগুলো পাঠ করা সুন্নত। এতে সকল বিপদাপদ ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত পাওয়া যায়।

সূরা নাস মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা, যা তাদের আল্লাহ তায়ালার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা এবং তাঁর কাছে যেকোনো বিপদ ও অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দেয়।


মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট