Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

২৪ জুলাই, ২০২৫ ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সুরা ফালাক অর্থসহ ব্যাখ্যা

সুরা ফালাক (আরবি: سورة الفلق; নিশিভোর) পবিত্র কুরআনের ১১৩তম সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ৫টি এবং এটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে বলে অধিকাংশ মুফাসসিরদের অভিমত। সুরা নাস (১১৩তম সুরা) এবং সুরা ফালাক (১১৪তম সুরা) - এই দুইটি সুরাকে একত্রে "মু'আওবিযাতাইন" বলা হয়, যার অর্থ "আশ্রয় চাওয়ার দুটি সুরা"। এই সুরাগুলোতে আল্লাহ তায়ালার কাছে বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।

সুরা ফালাকের অর্থ ও ব্যাখ্যা

সুরা ফালাকে ৫টি আয়াতে আল্লাহ তায়ালার কাছে বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। প্রতিটি আয়াতের অর্থ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:

১. قُلۡ اَعُوۡذُ بِرَبِّ الۡفَلَقِ

(বলুন, আমি প্রভাতের পালনকর্তার আশ্রয় গ্রহণ করছি।)

 * ব্যাখ্যা: এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে এবং তাঁর উম্মতকে প্রভাতের পালনকর্তা (আল্লাহ)-এর কাছে আশ্রয় চাইতে বলছেন। "ফালাক" শব্দের আভিধানিক অর্থ হল ফাটানো বা বিদীর্ণ করা। এখানে এর দ্বারা "প্রভাত" বা ভোরের আলো ফেটে বের হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। রাতের অন্ধকার চিরে যেমন ভোরের আলো আসে, তেমনি বিপদ-আপদ, দুশ্চিন্তা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত আছে যে, যিনি ভোরের সৃষ্টি করেন, তিনিই সব বিপদাপদ দূর করতে সক্ষম।

২. مِنۡ شَرِّ مَا خَلَقَ

(তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে।)

 * ব্যাখ্যা: এই আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে। সৃষ্টির অনিষ্ট বলতে খারাপ মানুষ, শয়তান, জিন, হিংস্র প্রাণী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানুষের নিজস্ব কুপ্রবৃত্তি - সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ কোনো কিছুকে অনিষ্টের জন্য সৃষ্টি করেননি, বরং তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই কল্যাণকর। যখন কোনো সৃষ্টি তার স্বাভাবিক বিধান লঙ্ঘন করে বা বিচ্যুত হয়, তখনই অনিষ্ট দেখা দেয়। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সবকিছুর অনিষ্ট থেকে একমাত্র আল্লাহই আমাদের রক্ষা করতে পারেন।

৩. وَ مِنۡ شَرِّ غَاسِقٍ اِذَا وَقَبَ

(অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়।)

 * ব্যাখ্যা: "গাসিক" শব্দের অর্থ অন্ধকার রাত বা রাতের অন্ধকার। "ওয়াকাব" অর্থ সমাগত হওয়া বা আচ্ছাদিত করা। রাতের অন্ধকার অনেক সময় বিভিন্ন বিপদ ও অনিষ্টের কারণ হয়। চোর, ডাকাত, শয়তানের কাজ, হিংস্র প্রাণীর আনাগোনা, জাদু ও অশুভ কর্ম—এসব কিছু রাতের অন্ধকারে বেশি ঘটে। তাই গভীর রাতের বিপদ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে।

৪. وَ مِنۡ شَرِّ النَّفّٰثٰتِ فِی الۡعُقَدِ

(গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে।)

 * ব্যাখ্যা: "নাফ্ফাসাত" অর্থ ফুঁৎকার দানকারী নারী, এখানে জাদুকারিনী বা জাদুকরদের বোঝানো হয়েছে, যারা গিঁটে ফুঁক দিয়ে জাদু করে। এর দ্বারা সব ধরনের জাদু-টোনা, বান মারা এবং ক্ষতিকারক কলাকৌশল থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যখন জাদু করা হয়েছিল, তখন এই সুরা এবং সুরা নাস অবতীর্ণ হয় এবং তিনি এই সুরা দুটি পড়ে সুস্থ হয়েছিলেন। এটি জাদু এবং এর কুপ্রভাব থেকে মুক্তির জন্য একটি শক্তিশালী দোয়া।

৫. وَ مِنۡ شَرِّ حَاسِدٍ اِذَا حَسَدَ

(এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।)

 * ব্যাখ্যা: "হাসিদ" অর্থ হিংসুক। হিংসা একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি। হিংসুক ব্যক্তি যখন অন্যের ভালো দেখতে পারে না এবং তার ক্ষতি কামনা করে, তখন তার হিংসার কারণে অন্যের ক্ষতি হতে পারে। হিংসার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে, কারণ হিংসুক ব্যক্তি মুখে কিছু না বললেও তার মনের বিদ্বেষ অন্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি বদনজরও লাগতে পারে।

সুরা ফালাকের গুরুত্ব ও ফজিলত

সুরা ফালাক এবং সুরা নাসকে বিভিন্ন বিপদ-আপদ, জাদু, বদনজর, হিংসা এবং সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও অসুস্থ হলে বা ঘুমানোর আগে এই দুটি সুরা পাঠ করতেন। এই সুরা দুটি পাঠের মাধ্যমে একজন মুসলিম নিজের সকল দুর্বলতা ও অসহায়তা থেকে আল্লাহর কাছে পূর্ণাঙ্গ আশ্রয় ও নিরাপত্তা লাভ করতে পারে।

এই সুরাগুলো পাঠের মাধ্যমে আমরা শিখি যে, যেকোনো অবস্থায় একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই আমাদের পরম আশ্রয়দাতা এবং তাঁর আশ্রয় ছাড়া আমরা কোনো অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নই।


মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট