সহকারী শিক্ষক
২৯ জুলাই, ২০২৫ ০৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ নবম
বিষয়ঃ কৃষি শিক্ষা
অধ্যায়ঃ অধ্যায় ৬
কাঁকরোল গ্রীষ্মকালীন একটি জনপ্রিয় সবজি। এটি পুষ্টিকর এবং বাজারে এর ভালো চাহিদা ও দাম থাকে। কাঁকরোল চাষের বিস্তারিত পদ্ধতি নিচে ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:
১. জাত নির্বাচন
কাঁকরোলের বেশ কয়েকটি জাত রয়েছে। কিছু পরিচিত জাত হলো:
* আসামী: গোলাকার ও বেঁটে ফল, সুস্বাদু।
* মণিপুরী: লম্বাটে ও অপেক্ষাকৃত চিকন, ফলন বেশি।
* মুকন্দপুরী, মধুপুরী, আলমী, টেম্পু, সবুজ টেম্পু ইত্যাদি।
ভালো ফলন ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী জাত নির্বাচন করা উচিত।
২. জমি নির্বাচন ও প্রস্তুতি
* মাটি: দো-আঁশ থেকে এঁটেল দো-আঁশ মাটি কাঁকরোল চাষের জন্য উত্তম। তবে পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করে অন্যান্য মাটিতেও এর চাষ করা যায়।
* জমির বৈশিষ্ট্য: কাঁকরোল জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই মাঝারি উঁচু বা উঁচু এবং সুনিষ্কাশিত ও বন্যামুক্ত জমি নির্বাচন করতে হবে।
* জমি তৈরি: জমিতে ৪-৬টি গভীর চাষ ও মই দিয়ে মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। আগাছা থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে।
৩. বপনের সময়
কাঁকরোলের মোথা (কন্দমূল) রোপণের উত্তম সময় হলো মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুন মাস। তবে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্তও মোথা রোপণ করা যায়।
৪. চারা তৈরি/মোথা রোপণ
* কাঁকরোল মূলত কন্দ (মোথা) থেকে চাষ করা হয়। বীজ থেকে চারা তৈরি করা গেলেও, তাতে পুরুষ গাছের সংখ্যা বেশি হয় এবং ফলন কম হয়। তাই মোথা রোপণ করাই উত্তম।
* মোথা রোপণের জন্য জমিতে প্রয়োজনীয় মাপে বেড বা মাদা তৈরি করে নিতে হবে।
* বেড: ২ মিটার প্রস্থের বেড তৈরি করুন। দুটি বেডের মাঝে ৩০ সেমি প্রস্থ এবং ২০ সেমি গভীরতার নালা রাখুন।
* মাদা: প্রতি বেডে দুটি সারি থাকবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২ মিটার। প্রতি সারিতে ৬০x৬০x৬০ সেমি আকারের মাদা তৈরি করুন। মাদা থেকে মাদার দূরত্ব হবে ২.৫ মিটার।
* মাদায় ৪-৬ সেমি গভীরে মোথা পুঁতে মাটি দিয়ে ঢেকে দিন। মাটির উপর খড় বিছিয়ে দিলে আর্দ্রতা বজায় থাকে।
* পুরুষ ও স্ত্রী মোথার অনুপাত: কাঁকরোলের পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে ফোটে। ভালো পরাগায়ন ও ফলনের জন্য ৯টি স্ত্রী গাছের মোথার সঙ্গে ১টি পুরুষ গাছের মোথা রোপণ করতে হবে। পুরুষ গাছে দেরিতে ফুল আসে বলে, স্ত্রী মোথা লাগানোর ১৫-২০ দিন আগে পুরুষ মোথা লাগানো ভালো।
৫. সার প্রয়োগ (প্রতি হেক্টরে)
সুষম সার প্রয়োগ কাঁকরোলের ভালো ফলনের জন্য জরুরি। নিচে হেক্টর প্রতি সারের পরিমাণ দেওয়া হলো:
* গোবর: ৩-৫ টন
* ইউরিয়া: ১২৫-১৫০ কেজি
* টিএসপি: ১০০-১২৫ কেজি
* এসওপি/এমওপি: ১০০-১২৫ কেজি
* জিপসাম: ৮০-১০০ কেজি
প্রয়োগ পদ্ধতি:
* গোবর: জমি তৈরির সময় মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিন।
* টিএসপি, এসওপি/এমওপি (অর্ধেক) এবং জিপসাম: চারা/মোথা লাগানোর ১৫ দিন আগে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিন।
* ইউরিয়া ও বাকি অর্ধেক এমওপি: মোথা গজানোর পর সমান ২-৩ ভাগে ভাগ করে যথাক্রমে ১৫ দিন, ৩০ দিন এবং ৬০ দিন পর উপরি প্রয়োগ করুন।
* যদি মাটি অধিক অম্লীয় হয়, তবে শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৮০-১০০ কেজি ডলোচুন প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারেন।
৬. পরিচর্যা
* আগাছা দমন: মোথা গজানোর পর নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
* সেচ: প্রয়োজন অনুযায়ী নালার সাহায্যে সেচ দিন। জমিতে যেন অতিরিক্ত পানি না জমে, কারণ কাঁকরোল জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। প্রয়োজনে অতিরিক্ত পানি নিকাশের ব্যবস্থা রাখুন।
* কাঠি ও মাচা তৈরি: কাঁকরোলের গাছ লতানো হওয়ায় এর সহায়তার প্রয়োজন হয়।
* গাছ ১০-১৫ সেমি লম্বা হলে গাছের গোড়ায় একটি করে বাঁশের কাঠি পুঁতে দিন।
* গাছ ৫০ সেমি লম্বা হলে মজবুত মাচা তৈরি করে দিতে হবে। মাচা বাঁশের খুঁটি ও তার দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে।
* কৃত্রিম পরাগায়ন: কাঁকরোলে প্রাকৃতিকভাবে পরাগায়ন কম হয়। তাই ভালো ফলনের জন্য প্রতিদিন ভোরবেলা পুরুষ ফুল সংগ্রহ করে স্ত্রী ফুলে আলতো করে ছুঁয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হয়।
৭. রোগ ও পোকা দমন
কাঁকরোলের কিছু সাধারণ রোগ ও পোকা রয়েছে:
* জাব পোকা: গাছের কচি পাতা ও ডগার রস শুষে নেয়, গাছ দুর্বল হয়ে যায়।
* দমন: আক্রান্ত অংশ অপসারণ, শুকনো ছাই প্রয়োগ, সাবান পানি বা তামাকের গুড়া মিশ্রিত পানি স্প্রে। প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন ইমিডাক্লোরোপ্রিড (এডমায়ার, ইমিটাফ) ব্যবহার করা যেতে পারে।
* ফল ছিদ্রকারী পোকা: পোকার কীড়া কচি ফল ও ডগা ছিদ্র করে খায়।
* দমন: আক্রান্ত ডগা ও ফল সংগ্রহ করে নষ্ট করা, ক্ষেত পরিষ্কার রাখা। নিমবিসিডিন এর মতো জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করা যায়। আক্রমণের তীব্রতা বেশি হলে রিপকর্ড, ডেসিস বা সুমিথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।
* মোজাইক রোগ: পাতায় হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইক দেখা যায়। জাপ পোকা ও সাদা মাছি এই রোগের বাহক।
* দমন: আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা বা ডাল কেটে দেওয়া। বাহক পোকা দমনের জন্য কীটনাশক ব্যবহার।
* সুটিমোল্ড রোগ: পাতা, ফল ও কাণ্ডে কালো ময়লা জমে। খোসা পোকা বা সাদা মাছির আক্রমণে এটি হয়।
* দমন: আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছাঁটাই করে ধ্বংস করা। বাহক পোকা দমন করা।
সতর্কতা: যেকোনো কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাত্রা এবং স্প্রে করার পর কতদিন সবজি সংগ্রহ করা যাবে না, তা ভালোভাবে জেনে নিন।
৮. ফল সংগ্রহ
রোপণের দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে কাঁকরোলে ফুল আসা শুরু হয়। পরাগায়নের প্রায় ২ সপ্তাহের মধ্যে ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। ফল হলুদ সবুজ হলেই সংগ্রহ করা যায়। নিয়মিত ফল সংগ্রহ করলে গাছের ফলন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
এই পদ্ধতি অনুসরণ করে কাঁকরোলের সফল চাষ করা সম্ভব।