Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

৩০ জুলাই, ২০২৫ ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ

সুরা অর্থ এবং ব্যাখ্যা

সূরা আল-ফালাক (ভোরের সূরা) - অর্থ ও ব্যাখ্যা

সূরা আল-ফালাক পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে ১১৩তম সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ একটি ছোট সূরা, যার আয়াত সংখ্যা ৫। এই সূরাটি মূলত শয়তানের কুমন্ত্রণা, জাদু, হিংসা এবং অন্যান্য অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার জন্য পাঠ করা হয়। সূরা নাস-এর সাথে একে একত্রে 'মু'আওয়িযাতাইন' (আশ্রয় প্রার্থনার দুটি সূরা) বলা হয়।

সূরার আরবি পাঠ, উচ্চারণ, এবং বাংলা অর্থ:

بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

পরম করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে।

১. قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلۡفَلَقِ

কুল আ‘ঊযু বিরব্বিল ফালাক্ব।

বলো, 'আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ভোরের রবের।'

২. مِن شَرِّ مَا خَلَقَ

মিন শাররি মা খালাক্বা।

'তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে।'

৩. وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ

ওয়া মিন শাররি গা-সিক্বিন ইযা- ওয়াক্বাব।

'আর অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে, যখন তা গভীর হয়।'

৪. وَمِن شَرِّ ٱلنَّفَّٰثَٰتِ فِي ٱلۡعُقَدِ

ওয়া মিন শাররিন নাফফা-ছা-তি ফিল ‘উক্বাদ।

'আর গ্রন্থিতে ফুঁৎকারকারী নারীদের (জাদুকরদের) অনিষ্ট থেকে।'

৫. وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

ওয়া মিন শাররি হা-সিদিন ইযা- হাসাদ।

'আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।'

সূরার ব্যাখ্যা:

এই সূরাটি আল্লাহর কাছে বিভিন্ন প্রকার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দেয়। এর প্রতিটি আয়াতের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু অনিষ্টের উল্লেখ করে তা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর আশ্রয় কামনা করা হয়েছে:

১. "কুল আ‘ঊযু বিরব্বিল ফালাক্ব।" (বলো, 'আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ভোরের রবের।')

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে 'আল-ফালাক্ব' (الفلق) শব্দের অর্থ হলো 'ভোর' বা 'प्रभात'। এর দ্বারা সেই সৃষ্টিকর্তাকে বোঝানো হয়েছে যিনি অন্ধকার রাতকে বিদীর্ণ করে ভোরকে প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, যিনি এত বড় কাজ করতে সক্ষম, তিনি যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা করতেও সক্ষম। কিছু ব্যাখ্যাকার 'আল-ফালাক্ব' দ্বারা জাহান্নামের একটি স্থান বা সমস্ত সৃষ্টিকেও বুঝিয়েছেন, যা অন্ধকার ভেদ করে উন্মোচিত হয়।

২. "মিন শাররি মা খালাক্বা।" (তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে।)

এটি একটি সাধারণ আশ্রয় প্রার্থনা। এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা যত প্রকার জিনিস সৃষ্টি করেছেন—তা মানুষ, জিন, পশু-পাখি, পোকামাকড়, গাছপালা বা যেকোনো জিনিস হোক—যদি তাদের দ্বারা কোনো ক্ষতি বা অনিষ্ট হয়, সেই সব অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এমন সব অনিষ্টও অন্তর্ভুক্ত, যা আমাদের অজানা।

৩. "ওয়া মিন শাররি গা-সিক্বিন ইযা- ওয়াক্বাব।" (আর অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে, যখন তা গভীর হয়।)

'গাসিক্বিন' (غاسق) অর্থ অন্ধকার বা রাত্রির আগমন। 'ওয়াক্বাব' (وقب) অর্থ যখন তা গভীর হয় বা ছেয়ে যায়। রাতের অন্ধকার নেমে আসার সাথে সাথে অনেক ধরনের অনিষ্ট ও বিপদ বেড়ে যায়। যেমন—অপরাধীরা সক্রিয় হয়, হিংস্র পশুপাখি বের হয়, জাদুকররা তাদের জাদু প্রয়োগ করে, এবং মানুষের মনে ভয় ও খারাপ চিন্তা আসতে পারে। এই আয়াতে সেই রাতের গভীর অন্ধকার থেকে সৃষ্ট সব অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।

৪. "ওয়া মিন শাররিন নাফফা-ছা-তি ফিল ‘উক্বাদ।" (আর গ্রন্থিতে ফুঁৎকারকারী নারীদের (জাদুকরদের) অনিষ্ট থেকে।)

'নাফফা-ছাত' (النفاثات) শব্দটি নারী জাদুকরদের বোঝায়, যারা গিঁট বা গ্রন্থিতে ফুঁক দিয়ে জাদু বা মন্দ কাজ করে। জাদু একটি বাস্তব জিনিস, যা মানুষকে শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই আয়াতের মাধ্যমে জাদু এবং জাদুকরদের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। যদিও এখানে 'নারী' উল্লেখ করা হয়েছে, এটি পুরুষ জাদুকরদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

৫. "ওয়া মিন শাররি হা-সিদিন ইযা- হাসাদ।" (আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।)

'হাসিদ' (حاسد) মানে হিংসুক ব্যক্তি, আর 'হাসাদ' (حسد) মানে হিংসা করা। হিংসা একটি মারাত্মক মানসিক ব্যাধি, যা অন্যের ভালো দেখলে অস্থির হয়ে পড়ে এবং তার ক্ষতি চায়। হিংসুক ব্যক্তি তার হিংসার মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করে বা তার মন্দ কামনা করে, যা বাস্তবে অন্যের ক্ষতিও ডেকে আনতে পারে। এই আয়াতে হিংসুক ব্যক্তির হিংসা থেকে সৃষ্ট সব ধরনের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।

সূরার গুরুত্ব:

সূরা ফালাক এবং সূরা নাস (মু'আওয়িযাতাইন) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূরা। রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠিন বিপদাপদ, রোগ-শোক এবং যেকোনো অনিষ্ট থেকে মুক্তির জন্য এই দুটি সূরা নিয়মিত পাঠ করতেন। হাদিসে এসেছে যে, ঘুমানোর আগে এই সূরাগুলো পাঠ করে হাতে ফুঁক দিয়ে পুরো শরীরে মুছে নিলে আল্লাহ তাআলা অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন। এটি মুসলিমদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে, যা আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা এবং তাঁর আশ্রয় প্রার্থনার গুরুত্ব শেখায়।

এই সূরাটি পাঠের মাধ্যমে আমরা শিখি যে, আমাদের জীবনের প্রতিটি বিপদ এবং অনিষ্ট থেকে একমাত্র আল্লাহই আমাদের রক্ষা করতে পারেন। তাই সর্বদা তাঁর কাছেই সাহায্য ও আশ্রয় চাওয়া উচিত।


মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট