প্রভাষক
০৫ মার্চ, ২০২৬ ০৬:২৩ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ একাদশ
বিষয়ঃ পদার্থবিজ্ঞান ১ম পত্র
ইউনিটঃ ১ম অধ্যায়: ভৌত জগৎ ও পরিমাপ
পরিমাপের ত্রুটি
পরিমাপের ত্রুটিগুলোকে উৎপন্নের ধরন অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়;
যথা-
১. যান্ত্রিক ত্রুটি:
ভৌত রাশি পরিমাপে যে সমস্ত যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সঠিক এবং সুবেদী না হলে পরিমাপে ত্রুটি দেখা দেয়। একে যান্ত্রিক ত্রুটি বলে। বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
(i) শূন্য ত্রুটি : সাধারণত ভার্নিয়ার স্কেল, ক্ষুগজ, স্লাইড ক্যালিপার্স, ফেরোমিটার ইত্যাদির প্রধান স্কেলের '০' দাগ ভার্নিয়ার বা বৃত্তাকার স্কেলের '০' দাগের সাথে না মিলে যদি আগে বা পিছনে থাকে, তবে একে শূন্য ত্রুটি বলে।
(ii) পিছট ত্রুটি: নাট-স্কু নীতির উপর ভিত্তি করে যেসব যন্ত্র তৈরি সেসব যন্ত্রে এই ত্রুটি
পরিলক্ষিত হয়। নতুন যন্ত্রের তুলনায় পুরাতন যন্ত্রে এই ত্রুটি বেশি দেখা যায়। কারণ অনেকদিন ব্যবহারের ফলে নাটের গর্ত বড় হয়ে যেতে পারে বা ক্রু ক্ষয় হয়ে আলগা হয়ে যায়; ফলে স্কুকে উভয় দিকে ঘুরালে সমান সরণ হয় না। এ ধরনের ত্রুটিকে পিছট ত্রুটি বলে। পাঠ নেওয়ার সময় যন্ত্রকে একই দিকে ঘুরালে এ ত্রুটি দূর হয়।
(iii) লেভেল ত্রুটি: কতগুলো পরীক্ষণের ক্ষেত্রে যন্ত্রকে ভালোভাবে লেভেলিং করে না নিলে
সঠিক পাঠ পাওয়া যায় না। যেমন নিক্তি, বিক্ষেপ চৌম্বকমান যন্ত্র, ট্যানজেন্ট গ্যালভানোমিটার ইত্যাদি। লেভেলিং স্কু এবং স্পিরিট লেভেলের সাহায্যে লেভেলিং করে নিতে হয়। এসব যন্ত্রে লেভেল ত্রুটি দেখা যায়।
২. পর্যবেক্ষণমূলক বা ব্যক্তিগত ত্রুটি :
পর্যবেক্ষকের পর্যবেক্ষণে ভুল এবং সঠিক মূল্যায়নের অভাবে এ ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। একে পর্যবেক্ষণমূলক ত্রুটি বা ব্যক্তিগত ত্রুটি বলে। পর্যবেক্ষণ ত্রুটি বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন-
(1) ব্যক্তিগত ত্রুটি,
(ii) প্রান্ত দাগ ত্রুটি
(iii) লম্বন ত্রুটি
(iv) সূচক ত্রুটি
(v) পরিবেশগত ত্রুটি।
৩. এলোমেলো বা অনিয়মিত ত্রুটি:
ত্রুটির বিভিন্ন বিষয়ে উপযুক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও কোনো একটি রাশির পাঠ বারবার ভিন্ন হতে দেখা যায়। পরিমাপে এ ধরনের ভিন্নতা বা পার্থক্য দুই ভাবে হতে পারে। যথা-
(১) পর্যবেক্ষকের পর্যবেক্ষণের ত্রুটির জন্য হতে পারে কিংবা
(২) পরীক্ষাকালে যন্ত্রের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণ পরিমাপের ক্ষেত্রে । পরিমাপ করার জন্য স্টপ ওয়াচ (stop watch) এবং । মাপার জন্য স্কেল সূচক ব্যবহার করা হয়। T পরিমাপের জন্য যদি ঘড়িটি ঠিকমতো চালানো এবং থামানো না হয় তবে T-এর পরিমাপে ভুল হবে।। পরিমাপের সময় সূচক যদি স্কেলের একটি নির্দিষ্ট দাগের সাথে না মিলে দুটি সন্নিহিত দাগের মধ্যে থাকে, তবে পর্যবেক্ষকের পক্ষে সূচকের অবস্থানের নির্ভুল মান স্কেল থেকে নেয়া সম্ভব হয় না। এ ধরনের ভুলগুলোকে অনিয়মিত বা এলোমেলো ত্রুটি বলে। এলোমেলো ত্রুটির ফলে চূড়ান্ত ফলাফল হয়তো অত্যন্ত বেশি অথবা খুব কম হতে পারে।
প্রতিকার: অনিয়মিত ত্রুটি পরিবর্তনশীল। প্রাপ্ত পাঠ প্রকৃত পাঠ অপেক্ষা বেশি হলে ধনাত্মক এবং কম হলে ঋণাত্মক হবে। এই ত্রুটি এড়াতে হলে সতর্কতার সাথে পাঠ নিতে হয়, এই ত্রুটি কমাতে হলে পরিমাপটি বার বার করতে হয়। অর্থাৎ এই ত্রুটি দূর করতে হলে অধিক সংখ্যক পাঠ গ্রহণ করে তাদের গড় পাঠ বের করতে হবে।
৪. পুনরাবৃত্তিক বা নিয়মিত ত্রুটি :
পরীক্ষাকালে কোনো কোনো ত্রুটির ফলে পরীক্ষাধীন রাশির পরীক্ষালব্ধ মান সর্বদাই এবং নিয়মিতভাবে রাশিটির প্রকৃত মান অপেক্ষা কম বা বেশি হতে পারে। এ ধরনের ত্রুটিকে নিয়মিত বা পুনরাবৃত্তিক ত্রুটি বলে। মিটার ব্রিজের প্রান্তিক ত্রুটি, পোটেনশিওমিটারের প্রান্তিক ত্রুটি, স্কুগজের শূন্য ত্রুটি এই ত্রুটির অন্তর্গত। অবশ্য পুনরাবৃত্তিক ত্রুটি নির্ণয় করার কোনো যুক্তিযুক্ত বা প্রামাণ্য উপায় নেই।
হয়।
প্রতিকার: এই ত্রুটি সংশোধনের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবস্থায় পরীক্ষাকার্যটি পুনরাবৃত্তি করা
পরম ত্রুটি: কোনো একটি রাশির প্রকৃত মান ও পরিমাপকৃত মানের পার্থক্যকে পরম ত্রুটি বলে। পরম ত্রুটির পরিবর্তে আমরা কখনো কখনো আপেক্ষিক ত্রুটি বা শতকরা ত্রুটি ব্যবহার করে থাকি।
অতএব, পরম ত্রুটি = প্রকৃত মান - পরিমাপ্য মান
শতকরা ত্রুটি = (প্রকৃত মান পরীক্ষালব্ধ মান/প্রকৃত মান) X 100%
সামগ্রিক বা মোট ত্রুটি (Gross error): পর্যবেক্ষকের অসতর্কতা বা অমনোযোগিতার কারণে এ ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষণ কর্ম সম্পাদন করে এ ত্রুটি দূর করা যায়।
৫. লঘিষ্ঠ গণন ত্রুটি:
ন্যূনতম যে পরিমাপ কোনো যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করা সম্ভব তাকে ওই যন্ত্রের লঘিষ্ঠ গুণন বলে। যেমন একটি মিটার স্কেলের সাহায্যে 1 mm বা 0°1 cm সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করা যায়। সুতরাং মিটার স্কেলের লঘিষ্ঠ গুণন 1 mm বা 0'1 cm। অনুরূপভাবে স্লাইড ক্যালিপার্সের ক্ষেত্রে লঘিষ্ঠ গুণন 0.01 mm, 0.001 cm। সূক্ষ্ম বা উন্নত মানের যন্ত্র ব্যবহার করে লঘিষ্ঠ গুণন ত্রুটি কমানো যায়। তবে একই পরিমাপ্য রাশির অধিক সংখ্যক পাঠ নিয়ে এবং ওই পাঠসমূহের গড় মান নির্ণয় করে পরিমেয় রাশির সঠিক মানের কাছাকাছি মান পাওয়া যায়। এলোমেলো বা অনিয়মিত এবং পুনরাবৃত্তি বা নিয়মিত ত্রুটির ক্ষেত্রে লঘিষ্ঠ গুণন ত্রুটি লক্ষ করা যায়।
সঠিকতা ও সূক্ষ্মতা:
বিভিন্ন ভৌত রাশি পরিমাপের জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি। যন্ত্রগুলো ব্যবহারের পূর্বে তাদের সঠিকতা ও সূক্ষ্মতা সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। এখন আমরা সঠিকতা ও সূক্ষ্মতা বলতে কী বুঝি তা আলোচনা করব।
সঠিকতা: কোনো যন্ত্রের সঠিকতা বলতে বোঝায় যে ওই যন্ত্র সংশ্লিষ্ট রাশিটির প্রকৃত মানের কত কাছাকাছি পরিমাপ করতে সক্ষম। রাশিটির প্রকৃত মান ও যন্ত্রটি দ্বারা পরিমাপ্য মান যত কাছাকাছি হয় যন্ত্রের সঠিকতা তত বেশি হয়।
ধরা যাক, একটি তুলাযন্ত্র (balance) দ্বারা 50 g ভরের একটি বস্তু পরিমাপ করে 45 g পাওয়া গেল। সুতরাং বলা যায় যে তুলা যন্ত্রটির সঠিকতা ভালো নয়। আবার, অন্য একটি তুলা যন্ত্র দ্বারা ওই বস্তুটি মেপে 49.5 g পাওয়া গেল। অতএব, দ্বিতীয় যন্ত্রটির সঠিকতা অনেক উন্নত মানের।
সূক্ষ্মতা: কোনো যন্ত্রের সূক্ষ্মতা বলতে বোঝায় যে ওই যন্ত্র দ্বারা সংশ্লিষ্ট রাশিটি পরিমাপ করতে পরপর (repeatedly) পরিমাপে প্রাপ্ত পাঠগুলো পরস্পরের কত কাছাকাছি হয়। পরপর পাঠগুলোর পার্থক্য যত কম হবে যন্ত্রটির সূক্ষ্মতা তত বেশি হবে। উদাহরণ-ধরা যাক একটি বস্তুর ভর 50 g। এটি তুলা যন্ত্রে ছয়বার পাঠ নিয়ে ভর পাওয়া গেল 48 g. 49.2 g. 49.3 g. 49.4 g. 49.6 g. 49.5 g। এক্ষেত্রে পরপর পাঠগুলোর পার্থক্য কম। তাই যন্ত্রটির সূক্ষ্মতা ভালো।