প্রভাষক
০৮ জুলাই, ২০২৬ ০৬:০২ পূর্বাহ্ণ
মানুষেমানুষের কানের গঠনঃ
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ দ্বাদশ
বিষয়ঃ জীববিজ্ঞান ২য় পত্র
অধ্যায়ঃ অধ্যায় ৮
মানুষের কানের গঠন
ভূমিকা
মানুষের কান (Ear) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবেদন অঙ্গ, যা শ্রবণ (Hearing) এবং দেহের ভারসাম্য (Balance) রক্ষার কাজ করে। কান শব্দতরঙ্গ গ্রহণ করে তাকে স্নায়বিক উদ্দীপনায় (Nerve impulse) রূপান্তর করে মস্তিষ্কে পাঠায়। এছাড়া মাথা ও শরীরের অবস্থান এবং গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
গঠনগতভাবে মানুষের কানকে তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়—
বহিঃকর্ণ (Outer Ear)
মধ্যকর্ণ (Middle Ear)
অন্তঃকর্ণ (Inner Ear)
১. বহিঃকর্ণ (Outer Ear)
বহিঃকর্ণ কানের বাইরের দৃশ্যমান অংশ। এটি শব্দতরঙ্গ সংগ্রহ করে মধ্যকর্ণে পৌঁছে দেয়।
(ক) কর্ণপল্লব (Pinna/Auricle)
কানের দৃশ্যমান অংশ।
স্থিতিস্থাপক তরুণাস্থি (Elastic cartilage) দ্বারা গঠিত।
নিচের নরম অংশকে কর্ণলতি (Ear lobe) বলা হয়।
কাজ:
চারদিক থেকে শব্দ সংগ্রহ করা।
শব্দকে বহিঃকর্ণ নালির দিকে পরিচালিত করা।
শব্দের উৎস নির্ণয়ে সাহায্য করা।
(খ) বহিঃকর্ণ নালি (External Auditory Canal)
দৈর্ঘ্য প্রায় ২.৫ সেমি।
ভেতরে সূক্ষ্ম লোম ও মোমগ্রন্থি (Ceruminous gland) থাকে।
মোম (Ear wax বা Cerumen) ধুলাবালি, পোকামাকড় ও জীবাণুর প্রবেশ রোধ করে।
কাজ:
শব্দতরঙ্গ কর্ণপর্দায় পৌঁছে দেওয়া।
কর্ণপর্দাকে সুরক্ষা প্রদান করা।
(গ) কর্ণপর্দা (Tympanic Membrane)
পাতলা, স্বচ্ছ ও ডিম্বাকার পর্দা।
বহিঃকর্ণ ও মধ্যকর্ণকে পৃথক করে।
শব্দতরঙ্গের আঘাতে কম্পিত হয়।
কাজ:
শব্দতরঙ্গকে যান্ত্রিক কম্পনে রূপান্তর করা।
কম্পন মধ্যকর্ণের অস্থিগুলোর কাছে পাঠানো।
২. মধ্যকর্ণ (Middle Ear)
মধ্যকর্ণ একটি বায়ুপূর্ণ গহ্বর। এটি কর্ণপর্দা ও অন্তঃকর্ণের মাঝখানে অবস্থিত।
মধ্যকর্ণের অংশসমূহ
(ক) শ্রবণ অস্থি (Auditory Ossicles)
মানবদেহের ক্ষুদ্রতম তিনটি অস্থি—
১. ম্যালিয়াস (Malleus)
হাতুড়ির মতো আকৃতির।
কর্ণপর্দার সঙ্গে যুক্ত।
কর্ণপর্দার কম্পন গ্রহণ করে।
২. ইনকাস (Incus)
নেহাই আকৃতির।
ম্যালিয়াস ও স্টেপিসের মধ্যে অবস্থান করে।
কম্পন এক অস্থি থেকে অন্য অস্থিতে পৌঁছে দেয়।
৩. স্টেপিস (Stapes)
রেকাব আকৃতির।
মানবদেহের সবচেয়ে ছোট অস্থি।
এটি ওভাল উইন্ডোর (Oval Window) সঙ্গে যুক্ত থাকে।
কম্পন অন্তঃকর্ণে প্রেরণ করে।
(খ) ইউস্টেশিয়ান নালি (Eustachian Tube)
মধ্যকর্ণকে গলবিল (Pharynx)-এর সঙ্গে সংযুক্ত করে।
দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৫–৪ সেমি।
কাজ:
মধ্যকর্ণের বায়ুচাপ ও বাহ্যিক বায়ুচাপ সমান রাখা।
কর্ণপর্দার স্বাভাবিক কম্পন বজায় রাখা।
(গ) ওভাল উইন্ডো (Oval Window)
স্টেপিসের সঙ্গে যুক্ত।
কম্পন অন্তঃকর্ণে প্রবেশ করায়।
(ঘ) রাউন্ড উইন্ডো (Round Window)
অন্তঃকর্ণে সৃষ্ট চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
৩. অন্তঃকর্ণ (Inner Ear)
অন্তঃকর্ণকে ল্যাবিরিন্থ (Labyrinth) বলা হয়। এটি শ্রবণ ও ভারসাম্যের প্রধান কেন্দ্র।
(ক) ককলিয়া (Cochlea)
শামুকের খোলসের মতো পাকানো।
ভেতরে অর্গান অব কর্টি (Organ of Corti) থাকে।
এখানে অসংখ্য শ্রবণগ্রাহী রোমকোষ (Hair cells) থাকে।
কাজ:
কম্পনকে স্নায়বিক উদ্দীপনায় রূপান্তর করা।
(খ) ভেস্টিবিউল (Vestibule)
ইউট্রিকল (Utricle) ও স্যাকুল (Saccule) নিয়ে গঠিত।
কাজ:
মাথার অবস্থান নির্ণয়।
স্থির ভারসাম্য রক্ষা।
(গ) অর্ধবৃত্তাকার নালি (Semicircular Canals)
তিনটি নালি থাকে—
অগ্র (Anterior)
পশ্চাৎ (Posterior)
পার্শ্বীয় (Lateral)
প্রতিটি নালির অ্যাম্পুলায় সংবেদনশীল রোমকোষ থাকে।
কাজ:
মাথার ঘূর্ণন ও চলাচল শনাক্ত করা।
গতিশীল ভারসাম্য বজায় রাখা।
(ঘ) শ্রবণ ও ভেস্টিবুলার স্নায়ু
ককলিয়া থেকে উৎপন্ন স্নায়ুকে ককলিয়ার স্নায়ু বলা হয়।
ভারসাম্য সংক্রান্ত অংশ থেকে ভেস্টিবুলার স্নায়ু উৎপন্ন হয়।
উভয়টি মিলেই ভেস্টিবুলোককলিয়ার স্নায়ু (অষ্টম করোটিক স্নায়ু) গঠন করে।
কাজ:
শ্রবণ ও ভারসাম্যের তথ্য মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়া।
মানুষের কানের কাজ
শব্দতরঙ্গ গ্রহণ করা।
শব্দের কম্পন বৃদ্ধি করা।
কম্পনকে স্নায়বিক উদ্দীপনায় রূপান্তর করা।
মস্তিষ্কে শব্দের অনুভূতি সৃষ্টি করা।
দেহের স্থির ও গতিশীল ভারসাম্য বজায় রাখা।
মাথার অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা।
শব্দ শোনার ধাপ
কর্ণপল্লব শব্দতরঙ্গ সংগ্রহ করে।
শব্দ বহিঃকর্ণ নালির মাধ্যমে কর্ণপর্দায় পৌঁছে।
কর্ণপর্দা কম্পিত হয়।
ম্যালিয়াস → ইনকাস → স্টেপিস কম্পন বৃদ্ধি করে।
স্টেপিস ওভাল উইন্ডো দিয়ে কম্পন ককলিয়ায় পাঠায়।
ককলিয়ার অর্গান অব কর্টির রোমকোষ উদ্দীপিত হয়।
শ্রবণ স্নায়ু উদ্দীপনা মস্তিষ্কে বহন করে।
মস্তিষ্ক শব্দকে শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করে।