Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০২:০৯ অপরাহ্ণ

১০০ বছরের কোয়ান্টাম বিতর্কের অবসান: অবশেষে স্বস্তিতে শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল!

কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের এক শতাব্দী পুরোনো বিতর্ক  যা এতদিন পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে বড় ধাঁধা ছিলো তা  হলো তরঙ্গ ফাংশন (Wave Function)।

একটি ক্ষুদ্র কণা (যেমন ইলেকট্রন) কোথায় আছে বা কীভাবে আচরণ করছে, তা হিসাব করার গাণিতিক নিয়মটিই হলো তরঙ্গ ফাংশন। কিন্তু বহুকাল ধরে পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি মৌলিক বিতর্ক ছিল: এই তরঙ্গ ফাংশন কি শুধুই কণাটি সম্পর্কে আমাদের 'ধারণা বা সম্ভাবনার হিসাব' দেয় (যেমন কাল বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ৭০%), নাকি এটি কণাটির 'আসল ফিজিক্যাল উপস্থিতি' জানায়?

​সহজ কথায়, তরঙ্গ ফাংশন কি কেবল পর্যবেক্ষণ করার আগে কণাটির অবস্থা সম্পর্কে মানুষের গাণিতিক সম্ভাবনার অনুমান, নাকি এটিই ক্ষুদ্রতম স্তরে প্রকৃতির নিজস্ব বাস্তব রূপ?


এই অস্পষ্টতা বোঝাতে ১৯৩৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঙ্গার তাঁর বিখ্যাত 'থট এক্সপেরিমেন্ট' অবতারণা করেছিলেন। তার মতে কোয়ান্টাম নিয়ম অনুযায়ী, পর্যবেক্ষণ করার আগ পর্যন্ত একটি কণা যেমন ইলেকট্রন একই সঙ্গে একাধিক অবস্থায় বা 'সুপারপজিশনে' থাকতে পারে। যদি এই কোয়ান্টাম নিয়মে ইলেকট্রনের মতো কোনো বন্ধ বাক্সে থাকা একটি বিড়ালের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তবে বাক্স না খোলা পর্যন্ত বিড়ালটিকে একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থাতেই ধরে নিতে হয়।


বিজ্ঞানীদের প্রধান দ্বিধা ছিল- বিড়ালের এই অদ্ভুত দশা কি শুধুই বাক্সের ভেতরের অবস্থা না জানার কারণে মানুষের অজ্ঞতার  ফল? নাকি প্রকৃতি বাস্তবিকই কোয়ান্টাম স্তরে এমন অদ্ভুত সুপারপজিশন বাস্তবতায় বিদ্যমান থাকে?


২০১২ সালে পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাথিউ পুসি, জোনাথন ব্যারেট এবং নিকোলাস রুডলফ একটি ঐতিহাসিক তত্ত্ব প্রস্তাব করেন, যা "PBR (Pusey-Barrett-Rudolph) থিওরেম" নামে পরিচিত। এই তত্ত্বটি বিজ্ঞানীদের দেয় সেই ধাধার সমাধান, যা স্পষ্ট করে দেয়- তরঙ্গ ফাংশন কি শুধুই মানুষের তথ্যগত ধারণা, নাকি প্রকৃতির নিজস্ব শারীরিক বাস্তবতা।


সম্প্রতি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সংকিংহাও ইয়াং  এবং তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষক দল এই তত্ত্বের আধুনিক পরীক্ষামূলক প্রয়োগ পরিচালনা করেন। এই পরীক্ষাটি চালানোর জন্য গবেষকেরা IBM-এর তৈরি অতি শক্তিশালী 'হিরণ'  নামক একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করেন।

  

​বিজ্ঞানীরা এই কম্পিউটারের মৌলিক তথ্য-একক বা 'কিউবিট' (qubit) গুলিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাজান, যাতে PBR তত্ত্বের সবকটি শর্ত সঠিকভাবে মেনে চলা যায়। এরপর কিউবিটগুলোর ভেতরের কোয়ান্টাম পরিবর্তনগুলো সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

​পরীক্ষার ফল যা এলো, তা কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের মূল ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে হুবহু মিলে যায়!


অর্থাৎ এই পরীক্ষাটি  সিদ্ধান্তমূলকভাবে প্রমাণ করেছে যে, পরমাণু বা কিউবিটের স্তরে তরঙ্গ ফাংশন কেবল মানুষের অসম্পূর্ণ জ্ঞান বা পরিসংখ্যাংত সম্ভাবনা নয়, এটি সরাসরি প্রকৃতির বস্তুগত ও শারীরিক বাস্তবতা (Ontic State)।


এর অর্থ হলো: সুপারপজিশনই আসল বাস্তবতা। অর্থাৎ কোয়ান্টাম স্তরে কণার একাধিক অবস্থায় (সুপারপজিশন) থাকাটা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বা ভুল হিসাব নয়। প্রকৃতি ক্ষুদ্রতম স্তরে বাস্তবিকই সুপারপজিশন হিসেবেই কাজ করে।


তাহলে বলা যায়, কোয়ান্টাম অবস্থার এই সুপারপজিশন রূপ মানুষের দেখা বা না দেখার ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় না। এটি পর্যবেক্ষণের আগেই বস্তুগত সত্য হিসেবে বিদ্যমান থাকে।


যদিও PBR থিওরেম এর মাধ্যমে তরঙ্গ ফাংশন যে প্রকৃতির এক বস্তুগত সত্য - তা প্রমাণিত হলেও, এই বিষয়ে আরও গবেষণা চলমান।  

​অবশ্য বাস্তব জীবনের কোনো বিড়ালের মতো বড় বস্তু পরিবেশের বাতাস, আলো বা অন্যান্য অণুর সাথে প্রতিনিয়ত ধাক্কা খায়। এই মিথস্ক্রিয়ার ফলে তার কোয়ান্টাম দশা সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় এবং বিড়ালটি যেকোনো একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থা (হয় জীবিত, নয় মৃত) গ্রহণ করে। আর সে কারণেই আমরা বাস্তব জীবনে কখনো একই সাথে জীবিত ও মৃত বিড়াল দেখি না।

​তা সত্ত্বেও, পরমাণুর ক্ষুদ্র স্তরে প্রকৃতি যে স্রেফ মানুষের কাগজের হিসাব নয়, বরং এই অদ্ভুত সুপারপজিশন  নিয়মেই সত্যি সত্যি বিদ্যমান তা প্রমাণিত হওয়ার মাধ্যমেই শ্রোডিঙ্গারের এই বিখ্যাত ধাঁধার অবসান হলো।

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট