Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব সহযোগিতায় বাংলাদেশ: আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা

বাংলাদেশ ও বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা
যুদ্ধ থেকে শান্তি: বিশ্ব সংস্থাসমূহ ও বৈশ্বিক ঐক্যের উত্থান
মানবতার ইতিহাসে সংঘাত এবং শান্তির মেলবন্ধন এক চিরন্তন সত্য। বিংশ শতাব্দীর দুটি বিধ্বংসী মহামারীতুল্য বিশ্বযুদ্ধ মানবজাতিকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, একাকী কোনো রাষ্ট্র নিরাপদ নয়। সংঘাত কাটিয়ে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থেকেই জন্ম নিয়েছিল আজকের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
১. ধ্বংসস্তূপ থেকে বৈশ্বিক কাঠামোর সূচনা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও জাতিপুঞ্জের (League of Nations) জন্ম ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধের ইতি ঘটলেও, ভবিষ্যতে এমন ধ্বংসলীলা এড়াতে ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিপুঞ্জ (League of Nations)। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এর সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অংগ্রহণ না করা, প্রভাবশালী দেশগুলোর নিজস্ব স্বার্থপরায়ণতা এবং নিজস্ব কোনো সশস্ত্র বাহিনী না থাকায় জাতিপুঞ্জ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং ১৯৪৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও জাতিসংঘের (United Nations) আত্মপ্রকাশ জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতার সুযোগে ভার্সাই চুক্তির অপমানজনক শর্ত ও নাৎসিবাদের উত্থান ঘটিয়ে হিটলার ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণ করলে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হলোকাস্টের মাধ্যমে ৬০ লাখ ইহুদি হত্যা এবং ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার বীভৎসতা বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
যুদ্ধের মধ্যেই ১৯৪১ সালে চার্চিল ও রুজভেল্ট 'আটলান্টিক সনদ'-এর মাধ্যমে এক নতুন শান্তির স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন সান ফ্রান্সিসকোতে ৫০টি দেশ জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর করে এবং ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ। নিউইয়র্কে সদর দপ্তর নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সংস্থায় ভিটো ক্ষমতাসম্পন্ন ৫টি স্থায়ী সদস্য (P5: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) বিশ্ব নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব গ্রহণ করে।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে চরম অপমানিত করে  বিশাল ক্ষতিপূরণ, ভূমি হারানো এবং সেনাবাহিনী সীমিত করা হয়। এই অর্থনৈতিক দুর্দশা ও জাতীয় লজ্জা থেকে জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।

এই সুযোগে অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসেন এবং নাৎসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেন   যার মূল ভিত্তি ছিল জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব, ইহুদি বিদ্বেষ এবং একনায়কতন্ত্র। ১৯৩৩ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর হিটলার জার্মানিতে সম্পূর্ণ স্বৈরশাসন কায়েম করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে (১৯৩৯–৪৫) নাৎসি শাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো হলোকাস্ট  পরিকল্পিতভাবে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিসহ লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়।

সহজ কথায়: ভার্সাই চুক্তির ক্ষোভ → নাৎসিবাদের জন্ম → হলোকাস্টের ভয়াবহতা। একটি অন্যায় চুক্তি কীভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যার কারণ হতে পারে — এটি তারই উদাহরণ।


২. বিশ্বযুদ্ধের পরাশক্তি: অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তি
দুই বিশ্বযুদ্ধেই বিশ্ব দুটি মূল ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল:
• প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪–১৯১৮):
◦ কেন্দ্রীয় শক্তি (অক্ষশক্তি): জার্মানির নেতৃত্বে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, উসমানীয় সাম্রাজ্য (তুরস্ক) ও বুলগেরিয়া।
◦ মিত্রশক্তি: ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া (১৯১৭ পর্যন্ত), ইতালি এবং পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া যুক্তরাষ্ট্র।
• দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯–১৯৪৫):
◦ অক্ষশক্তি: ফ্যাসিবাদী এবং সামরিকতাবাদী জোট — জার্মানি (হিটলার), ইতালি (মুসোলিনী) ও জাপান (তোজো)।
◦ মিত্রশক্তি: গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক মিত্রতা — ব্রিটেন (চার্চিল), যুক্তরাষ্ট্র (রুজভেল্ট), সোভিয়েত ইউনিয়ন (স্তালিন), ফ্রান্স ও চীন।
(উল্লেখ্য, উভয় যুদ্ধেই মিত্রশক্তি চড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।)


৩. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠন এবং এদের প্রয়োজনীয়তা
একটি পরাসংযুক্ত বিশ্বে সীমানা কেটে বিশ্বজনীন সমস্যা সমাধান করা অসম্ভব। পরিবেশ রক্ষা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, যুদ্ধ প্রতিরোধ কিংবা মহামারি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলো এক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের তালিকা:
আন্তর্জাতিক সংগঠন
জাতিসংঘ (UN), বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ (IMF), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), আন্তর্জাতিক আদালত (ICJ), ইন্টারপোল।
আঞ্চলিক সংগঠন
সার্ক (SAARC), আসিয়ান (ASEAN), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU), ওআইসি (OIC), ন্যাটো (NATO), জি-৭ (G-7), জি-২০ (G-20), এপেক (APEC)।
এগুলোর প্রয়োজনীয়তা:
• আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা: সংঘাত নিরসন ও সামরিক উত্তেজনা কমানো।
• অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: পারস্পরিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য হ্রাস।
• মানবাধিকার ও স্বাস্থ্য রক্ষা: বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধ ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার সুসংহতকরণ।
• জলবায়ু ও পরিবেশ: সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলায় একযোগে কাজ করা।
৪. জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গসংস্থা ও সার্ক-এর আদ্যোপান্ত
1. ইউনিসেফ (UNICEF)United Nations Children's Fund (জাতিসংঘ শিশু তহবিল)।
​বিশ্বের শিশুদের অধিকার রক্ষা ও জরুরি সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের অন্যতম জনপ্রিয় অঙ্গসংস্থা।
​সদর দপ্তর: নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।
​গঠন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জরুরি খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য ১১ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে এটি গঠিত হয়।
​মূল উদ্দেশ্য: বিশ্বের প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সার্বিক বিকাশ সুনিশ্চিত করা এবং তাদের অধিকার রক্ষা করা।
​প্রধান কার্যক্রম: ​শিশু টিকাদান ও স্বাস্থ্য: বিশ্বজুড়ে পোলিও, হামসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে।
​শিক্ষা বিস্তার: বিশেষ করে সংকটপূর্ণ এলাকা ও দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
​পুষ্টি ও ত্রাণ সহায়তা: যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে শিশু ও মায়েদের জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ করা।
​শিশু সুরক্ষা: শিশুশ্রম, শিশু পাচার, বাল্যবিবাহ এবং শিশুদের ওপর হিংস্রতা প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে কাজ করে।
​শিশু অধিকার সনদ (CRC): জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করে।
UNESCO:  United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization (জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা)।
​জ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি সুদৃঢ় করার কাজে নিয়োজিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সংস্থা।
​সদর দপ্তর: প্যারিস, ফ্রান্স।
​গঠন: ৪ নভেম্বর ১৯৪৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটির সনদ কার্যকর হয়।
​মূল উদ্দেশ্য: শিক্ষা, প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং যোগাযোগের মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
​প্রধান কার্যক্রম:
​বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ: পৃথিবীর ঐতিহাসিক, প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহনকারী স্থানগুলোকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ (World Heritage Site) হিসেবে ঘোষণা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে (যেমন: বাংলাদেশের সুন্দরবন ও বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ)।
​শিক্ষা ও নিরক্ষরতা দূরীকরণ: বিশ্বের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৌলিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দেওয়া।
​সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ভাষা রক্ষা: বিলুপ্তপ্রায় ভাষা সংরক্ষণ এবং বিশ্ব জুড়ে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি করা। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দান এর অন্যতম বড় উদাহরণ।
​মুক্ত গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তি: স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সুষম বণ্টনে ভূমিকা রাখা।
​৩. ইউএনডিপি (UNDP)United Nations Development Programme (জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি)।
​বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও টেকসই মানব উন্নয়নের মূল কাণ্ডারি হলো ইউএনডিপি।
​সদর দপ্তর: নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।
​গঠন: জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
​মূল উদ্দেশ্য: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য নির্মূল, চরম বৈষম্য হ্রাস এবং টেকসই মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
​প্রধান কার্যক্রম:প্রতিষ্ঠানটি প্রধানত ছয়টি ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করে এর মধ্যে 
​দারিদ্র্য বিমোচন ও সুশাসন: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান তৈরি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা।
​জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহারে বিশ্বজুড়ে প্রকল্প পরিচালনা।
​মানব উন্নয়ন সূচক (HDI) প্রকাশ: প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে শিক্ষা, আয় ও গড় আয়ুকালের ওপর ভিত্তি করে বিখ্যাত Human Development Index (HDI) প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
​এসডিজি (SDG) বাস্তবায়ন: জাতিসংঘের ‘টেকসই উন্নয়ন ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রা’ (SDGs)  অর্জনে সদস্য দেশগুলোকে আর্থিক ও কারিগরি পরামর্শ দেওয়া।

​৪. ফাও (FAO)Food and Agriculture Organization (বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা)।
​“ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গঠন” সংকল্প নিয়ে কাজ করে যাওয়া জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা।
​সদর দপ্তর: রোম, ইতালি।
​গঠন: ১৬ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে কানাডার কুইবেক সিটিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। (এই দিনটি স্মরণে প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ হিসেবে পালিত হয়)।
​মূল উদ্দেশ্য: বিশ্ব থেকে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দূর করা এবং কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
​প্রধান কার্যক্রম:
​কৃষি উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন: আধুনিক কৃষিতথ্য, উন্নত বীজ, সেচ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করা।
​জরুরি খাদ্য সংকট মোকাবেলা: খরা, বন্যা বা যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ রোধে বিশ্ব খাদ্য চাহিদার পূর্বাভাস দেওয়া ও ত্রাণ সমন্বয় করা।
​মৎস্য ও বনায়ন সম্পদ রক্ষা: টেকসই উপায়ে সামুদ্রিক ও বনজ সম্পদ আহরণের জন্য আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা তৈরি।
​খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিমান: খাদ্যে বিষাক্ত উপাদানের ব্যবহার রোধ করা এবং সাধারণ মানুষের পুষ্টির মান বাড়ানোর কৌশল নির্ধারণ।
​৫. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
​বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করার শীর্ষ আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ।
​পূর্ণরূপ: World Health Organization (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)।
​সদর দপ্তর: জেনেভা, সুইজারল্যান্ড।
​গঠন: ৭ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। (প্রতি বছর ৭ এপ্রিল ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত হয়)।
​মূল উদ্দেশ্য: বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য সর্বোচ্চ সম্ভাব্য শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের মান অর্জন করা।
​প্রধান কার্যক্রম:
​মহামারি ও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ: কোভিড-১৯, ইবোলা, ডেঙ্গুর মতো বৈশ্বিক মহামারি ও সংক্রামক রোগ মোকাবেলায় নেতৃত্ব দেওয়া এবং নির্দেশিকা জারি করা।
​রোগ নির্মূল অভিযান: পোলিও, গুটিবসন্ত, টিবি ও ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ পৃথিবী থেকে পুরোপুরি নির্মূলের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা।
​স্বাস্থ্য খাত সংস্কার ও গবেষণা: নতুন ওষুধ ও টিকার মান যাচাই করা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা।
​জরুরি স্বাস্থ্যসেবা: যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে জরুরি ফিল্ড হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া।
​৬. ইউএনএফপিএ (UNFPA)
​নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত বিশেষায়িত তহবিল।
​পূর্ণরূপ: United Nations Population Fund (জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল)।
​সদর দপ্তর: নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।
​গঠন: ১৯৬৯ সালে এটি গঠিত হয় (প্রথমে এটি United Nations Fund for Population Activities নামে পরিচিত ছিল)।
​মূল উদ্দেশ্য: প্রতিটি গর্ভাবস্থা যেন কাঙ্ক্ষিত হয়, প্রতিটি প্রসব যেন নিরাপদ হয় এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণী যেন তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে তা সুনিশ্চিত করা।
​প্রধান কার্যক্রম:
​মাতৃস্বাস্থ্য ও নিরাপদ প্রসব: প্রসূতি মায়ের চিকিৎসা সেবা বৃদ্ধি এবং সন্তান জন্মদানের সময় মাতৃমৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করা।
​পরিবার পরিকল্পনা: পরিকল্পিত পরিবার গঠন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত শিক্ষা ও সেবা বিশ্বব্যাপী পৌছে দেওয়া।
​নারীর ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষা: বাল্যবিবাহ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ ও প্রচার চালানো।
​জনশুমারি ও উপাত্ত তথ্য: সদস্য দেশগুলোকে নিখুঁত জনশুমারি (Census) পরিচালনা এবং জনসংখ্যা সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে কারিগরি সহায়তা দেওয়া।
​৭. সার্ক (SAARC)
​দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বন্ধন ও পারস্পরিক আর্থ-সামাজিক প্রগতির প্ল্যাটফর্ম।
​পূর্ণরূপ: South Asian Association for Regional Cooperation (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা)।
​সদর দপ্তর: কাঠমান্ডু, নেপাল।
​গঠন: ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে সার্ক গঠিত হয়। (বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অগ্রণী উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল)।
​সদস্য দেশ (৮টি): বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তান।
​মূল উদ্দেশ্য: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি এবং যৌথ সহযোগিতার ভিত্তি মজবুত করা।
​প্রধান কার্যক্রম:
​আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রসারণ: সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে পণ্য কেনাবেচার জন্য ‘সাফটা’ (SAFTA - South Asian Free Trade Area) চুক্তি বাস্তবায়ন।
​দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য ব্যাংক: দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দিলে আপৎকালীন ব্যবহারের জন্য 'সার্ক ফুড ব্যাংক' পরিচালনাসহ দারিদ্র্য বিমোচনে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ।
​শিক্ষাক্ষেত্রে আদান-প্রদান: নতুন দিল্লিতে অবস্থিত ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি’ (SAU)-এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি।
​সন্ত্রাসবাদ দমন ও পরিবেশ সংরক্ষণ: আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ রোধে তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার যৌথ চেষ্টা।
​জাতিসংঘের এই অঙ্গসংস্থাগুলো এবং আঞ্চলিক জোট সার্ক না থাকলে আজকের আধুনিক বিশ্ব বহু মহামারি, অনাহার ও যুদ্ধবিগ্রহের মুখোমুখি হতো। এই সংগঠনগুলোর নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে একটি সমৃদ্ধ, শান্তিময় ও সাম্যভিত্তিক ভবিষ্যৎ পৃথিবীর স্বপ্ন।


সাগর কর্মকার

সহকারী শিক্ষক

বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল, হবিগঞ্জ। 

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট