জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) কারণে সৃষ্ট অন্যতম প্রধান ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা (Waterlogging)। বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের পানি দ্রুত নেমে না গিয়ে যখন কোনো অঞ্চলে দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস আটকে থাকে, তখন তাকে জলাবদ্ধতা বলে। বাংলাদেশে বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় জেলাগুলো (যেমন: সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর) এবং বড় বড় নগরগুলোতে (যেমন: ঢাকা ও চট্টগ্রাম) এই সমস্যা এখন প্রকট রূপ ধারণ করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জলাবদ্ধতা এবং এর প্রভাবের মূল বিষয়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
জলাবদ্ধতা সৃষ্টির প্রধান কারণসমূহ
- সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: সমুদ্রের পানির স্তর ওপরে উঠে আসায় উপকূলীয় অঞ্চলের ভেতরের পানি স্বাভাবিকভাবে নদীতে বা সাগরে নামতে পারে না।
- অপরিকল্পিত বাঁধ ও অবকাঠামো: নদী ও খালের ওপর অপরিকল্পিত রেগুলেটর, স্লুইস গেট এবং বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
- নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উজান থেকে আসা পলিমাটি নদীর তলদেশে জমে নদীগুলোকে নাব্যতাহীন করে তুলছে। ফলে নদীগুলো বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি টেনে নিতে পারে না।
- শহরাঞ্চলে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা: বড় শহরগুলোতে খাল-বিল ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
জলাবদ্ধতার মারাত্মক প্রভাব
- কৃষিজমি স্থায়ীভাবে অকেজো হওয়া: মাসের পর মাস ফসলি জমি পানির নিচে ডুবে থাকার কারণে কৃষকেরা কোনো ফসল (বিশেষ করে আমন ধান) ফলাতে পারেন না। মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় এবং গাছপালার শিকড় পচে মারা যায়।
- অর্থনৈতিক বিপর্যয়: জলাবদ্ধতার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং মাছের ঘের ভেসে গিয়ে মানুষ চরম ঋণের মুখে পড়ে।
- স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানবেতর জীবনযাপন: বসতভিটা ও উঠানে নোংরা পানি জমে থাকায় মশার উপদ্রব বাড়ে, যা ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়ায়। পাশাপাশি চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে।
- বাস্তুচ্যুতি বা পরিবেশগত শরণার্থী: বছরের পর বছর জলাবদ্ধ থাকার কারণে অনেক পরিবার তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে এসে বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।