মিষ্টি পানিতে গলদা চিংড়ি চাষ বর্তমানে একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। বাগদা চিংড়ি লোনা পানিতে চাষ হলেও, গলদা চিংড়ি সাধারণত মিষ্টি পানি বা সামান্য লবণাক্ত পানিতে (যেমন পুকুর, দীঘি বা ঘেরে) চাষ করা হয়। গলদা চিংড়ির মাথায় একটি লম্বা করাত আকৃতির তরবারি বা রোস্ট্রাম থাকে এবং পুরুষ চিংড়ির সামনের পা দুটি বেশ বড় ও নীল রঙের হয়।
নিচে গলদা চিংড়ি চাষের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. পুকুর বা ঘের প্রস্তুতকরণ
- পুকুরের আকার ও গভীরতা: চাষের জন্য ৩০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশের পুকুর বা ঘের সবচেয়ে ভালো। পানির গভীরতা ৪ থেকে ৫ ফুট রাখা প্রয়োজন।
- কাদা অপসারণ ও শুকানো: পুকুর শুকিয়ে তলার অতিরিক্ত কাদা তুলে ফেলতে হবে এবং রোদে ভালোভাবে শুকাতে হবে।
- চুন ও সার প্রয়োগ: মাটির গুণাগুণ ভেদে প্রতি শতাংশে ১ থেকে ১.৫ কেজি চুন দিতে হবে। চুন দেওয়ার ৭ দিন পর প্রাকৃতিক খাদ্য (প্লাঙ্কটন) তৈরির জন্য শতাংশ প্রতি ৪-৫ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট এবং ১০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম টিএসপি সার প্রয়োগ করতে হবে।
- আশ্রয়স্থল তৈরি: গলদা চিংড়ি খোলস বদলানোর সময় দুর্বল থাকে এবং একে অপরকে আক্রমণ করতে পারে। তাই পুকুরের তলায় বাঁশের ডালপালা, নারকেলের পাতা বা পিভিসি পাইপের টুকরো দিয়ে কৃত্রিম আশ্রয়স্থল তৈরি করে দিতে হবে।
২. পোনা সংগ্রহ ও মজুদ
- পোনা নির্বাচন: সুস্থ, সবল ও সমান আকারের হ্যাচারি বা নদী থেকে সংগৃহীত পোনা (PL-20) নির্বাচন করতে হবে।
- পোনা মজুদ ঘনত্ব: একক চাষের ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে ৪০ থেকে ৫০টি গলদা পোনা মজুদ করা যায়। (রুই বা কাতলা মাছের সাথে মিশ্র চাষও করা সম্ভব)।
- খাপ খাওয়ানো: পোনা ছাড়ার আগে ঘেরের পানির তাপমাত্রার সাথে পোনার পাত্রের পানিকে ১৫-২০ মিনিট ধরে আস্তে আস্তে মিশিয়ে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। খুব ভোরে বা সন্ধ্যার ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় পোনা ছাড়তে হবে।
৩. খাদ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা
- সম্পূরক খাদ্য: পোনা ছাড়ার পরদিন থেকেই প্রতিদিন নিয়ম করে চিংড়ির ওজনের শতকরা অনুপাতে (৩% থেকে ১০% হারে) সুষম বাণিজ্যিক ফিড বা সম্পূরক খাদ্য দিতে হবে। চালের কুঁড়া, গম বা সরিষার খৈল এবং শুঁটকি মাছের গুঁড়ার মিশ্রণও দেওয়া যায়।
- নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: গলদা চিংড়ি রাতের বেলা খাবার খায়, তাই মোট খাবারের ৬০-৭০% সন্ধ্যায় বা রাতে এবং বাকি অংশ ভোরে দিতে হবে।
- পানির গুণগত মান: পুকুরের পানি পরিষ্কার ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ রাখতে হবে। প্রয়োজনে পানি পরিবর্তন বা এয়ারেটর (Aerator) ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. চিংড়ি আহরণ
- পোনা ছাড়ার ৬ থেকে ৭ মাসের মধ্যে গলদা চিংড়ি বিক্রির উপযোগী হয়। সাধারণত প্রতিটি চিংড়ির ওজন ৬০ থেকে ১০০ গ্রাম বা তার বেশি হলে তা বাজারজাত করা যায়।
আপনি কি গলদা চিংড়ি এককভাবে চাষ করতে চান নাকি অন্য কোনো কার্প জাতীয় মাছের (রুই, কাতলা) সাথে মিশ্র চাষ করার কথা ভাবছেন? জানালে সেই অনুযায়ী সঠিক মজুদ ঘনত্ব ও খাদ্য তালিকা তৈরি করে দিতে পারবো।