'বই পড়া' প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর একটি কালজয়ী ও চিন্তাশীল রচনা, যা তাঁর 'প্রবন্ধ সংগ্রহ' থেকে সংকলিত হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত এই প্রবন্ধে লেখক সমাজের স্থূল মানসিকতা এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার গলদ দূর করে স্বশিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মানুষ গঠনে বই পড়ার ও লাইব্রেরির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
প্রবন্ধটির মূল বিষয়বস্তু ও প্রধান দিকগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. বই পড়ার গুরুত্ব ও মানসিক সজীবতা
প্রমথ চৌধুরীর মতে, বই পড়া মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ হলেও বর্তমান যুগে এটি অনেকের কাছে বিলাসিতা মনে হতে পারে। কারণ আমাদের সমাজ আর্থিক অনটন এবং বাস্তববাদী বা বস্তুবাদী চিন্তায় আচ্ছন্ন। মানুষ কেবল সেই জিনিসটিরই মূল্য দেয়, যা থেকে সরাসরি নগদ অর্থ উপার্জন করা যায়। অথচ সাহিত্যচর্চা ও বই পড়া মানুষের মনের সজীবতা ও শক্তি বজায় রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। একটি সভ্য ও সংস্কৃতমনা জাতি গঠনে সাহিত্যের বিকল্প নেই।
২. প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা
প্রবন্ধে লেখক আমাদের দেশের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি একে "নোট গেলানো" পদ্ধতির সাথে তুলনা করেছেন।
- স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের জোর করে পাঠ্যবই ও নোট মুখস্থ করানো হয়।
- এই জোরপূর্বক গিলিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং নিজে নিজে শেখার বা স্বশিক্ষিত হওয়ার শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
- মানুষ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ভুলে কেবল সার্টিফিকেট লাভ ও পাসের পেছনে ছুটছে।
৩. লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা ও "মনের হাসপাতাল"
লেখক মনে করেন, জোর করে কাউকেই বিদ্যা অর্জন করানো যায় না; বরং নিজেকেই স্বশিক্ষিত হতে হয়। এই স্বশিক্ষিত হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হলো লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার।
- প্রবন্ধে লাইব্রেরিকে "মনের হাসপাতাল" হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মানুষ যেভাবে শরীরের অসুস্থতা দূর করতে হাসপাতালে যায়, তেমনি মনের সংকীর্ণতা ও অসুস্থতা দূর করতে লাইব্রেরিতে যাওয়া উচিত।
- লাইব্রেরিতে মানুষ নিজের রুচি ও ইচ্ছা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বই পড়তে পারে, যা স্কুল-কলেজে সম্ভব হয় না। তাই প্রমথ চৌধুরীর মতে, সমাজে হাসপাতালের চেয়েও লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।
৪. প্রমথ চৌধুরী ও 'সবুজ পত্র' প্রসঙ্গ
প্রবন্ধের মূল ভাবনার পেছনে প্রমথ চৌধুরীর (ছদ্মনাম: বীরবল) নিজস্ব সাহিত্যিক ভাবাদর্শ কাজ করেছে। ১৯১৪ সালে তাঁর সম্পাদিত বিখ্যাত
সবুজ পত্র পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার চল এবং মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটান। 'বই পড়া' প্রবন্ধেও সেই যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে।
মূল কথা: 'বই পড়া' প্রবন্ধের মূল বাণী হলো— জাতি হিসেবে যদি আমরা মানসিক দেউলিয়াত্ব থেকে বাঁচতে চাই এবং সভ্য সমাজ গড়তে চাই, তবে অর্থচিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে মনের খোরাক জোগাতে হবে এবং এর জন্য বই পড়া ও লাইব্রেরি চর্চাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।